সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্রের দৌরাত্ম্যে মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রীরা আতঙ্কের মুখে। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর ও উত্তরাঞ্চলকে সংযুক্ত করা বিভিন্ন মহাসড়ক এবং আঞ্চলিক সড়কে প্রায়ই ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। যাত্রী, চালক ও পণ্যবাহী যানবাহনের কর্মীদের জন্য দীর্ঘ পথের যাত্রা ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় ডাকাতদের এমন তৎপরতা রোধের দায় কার? ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত থাকার পরও অপরাধীরা কীভাবে বারবার হামলার সুযোগ পাচ্ছে?
পুলিশ সদর দপ্তর পরিসংখ্যান পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ১২৩টি। একই সময়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ৪৬৭টি। এসব তথ্য পুলিশের নথিভুক্ত অপরাধের হিসাব। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মামলা না হওয়ার কারণে অনেক ঘটনা সরকারি পরিসংখ্যানে স্থান পায় না। অর্থাৎ নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যা দিয়েই সড়কে মানুষের প্রকৃত নিরাপত্তাহীনতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত অন্তত ১৫টি স্থানকে ডাকাতিপ্রবণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণত দুই ধরনের ডাকাতির ঘটনা ঘটে। একদিকে নির্জন সড়ক বেছে নিয়ে ডাকাতি করা হয়; অন্যদিকে প্রবাসী বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। অপরাধের ধরন যখন পুলিশের জানা, তখন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকার কারণ কী। শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মামলা গ্রহণ, কয়েকজনকে গ্রেপ্তার কিংবা অভিযান চালানোর খবর প্রচার করে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। জনগণ জানতে চান, এসব অভিযানে কতজন সংঘবদ্ধ ডাকাত গ্রেপ্তার হয়েছে, কতটি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে, কতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং কতটি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও হাইওয়ে পুলিশকে সমন্বিতভাবে সড়ক নিরাপত্তার জবাবদিহিমূলক কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করতে পারলে চলমান অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোয় টহলের নির্দিষ্ট সময়সূচি, জনবল, নজরদারির ব্যবস্থা এবং জরুরি সহায়তা পাওয়ার কার্যকর পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি ডাকাতির ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, অপরাধী চক্র শনাক্ত এবং আন্তজেলা যোগাযোগব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত বিরতিতে অপরাধের পরিসংখ্যান, তদন্তের অগ্রগতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার বাস্তবায়নের অবস্থা প্রকাশ করা জরুরি। কোনো এলাকায় বারবার ডাকাতির ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে হবে; দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুতর অপরাধে জড়িতদের গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিনে মুক্তি, দীর্ঘ বিচার-প্রক্রিয়া এবং যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ার প্রবণতা পুনরায় অপরাধে জড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে জামিনকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষীর নিরাপত্তা, শক্তিশালী অভিযোগপত্র এবং সময়মতো বিচার। একই সঙ্গে তদন্তে গাফিলতি ও মামলার অগ্রগতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সড়কে ডাকাতি কোনো বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত সমস্যা নয়; এটি নাগরিকের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যাত্রী বা চালক ডাকাতের হামলার শিকার হলে তাদেরই কেন নিরাপত্তার ঝুঁকি বহন করতে হবে? ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত থাকার পরও অপরাধ ঘটলে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। মানুষ শুধু গ্রেপ্তারের ঘোষণা শুনতে চান না; চান অপরাধ কমার প্রমাণ, দ্রুত বিচার এবং নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তা। সড়ক ও মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার হিসাবও সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।
