মওদূদীর জিন্নাহ বিরোধিতার মূলে ছিল দুটি ভিন্ন রাষ্ট্রকল্পনা; মুসলিম লীগ ও জিন্নাহ চেয়েছিলেন মুসলমানদের জন্য একটি রাষ্ট্র, আর মওদূদী চেয়েছিলেন ইসলামের রাষ্ট্র। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মের মধ্য দিয়ে প্রথম দফায় জয় হয় জিন্নাহর। কিন্তু নতুন রাষ্ট্রের আদর্শিক রূপ কী হবে, ওই লড়াই শুরু হয় ঠিক তখন থেকে। সেখানে মওদূদী শেষ পর্যন্ত যে জায়গা করে নিলেন, তার পেছনে তার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা বা দলের সাংগঠনিক শক্তির চেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে শাসকগোষ্ঠীর বৈধতার সংকট এবং নীতিনির্ধারণে তাদের আত্মবিশ্বাসের অভাব। এই দুই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে শাসকরা বারবার ইসলামকে টেনে এনেছেন রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনাকেন্দ্রে।
দেশভাগে পাঠানকোটে ভারতের ভাগে পড়লে মওদূদী লাহোরে চলে আসেন। যে রাষ্ট্রের জন্ম তিনি চাননি, সেখানেই শুরু করেন নতুন রাজনীতি। কৌশল বদলাল, লক্ষ্য বদলাল না। পাকিস্তান যখন বাস্তবতা, লড়াই এখন তাকে ইসলামি রাষ্ট্রে রূপান্তরের। ভারতে থেকে যাওয়া জামায়াতের অংশ অবশ্য নিল ভিন্ন পথ। নৃবিজ্ঞানী ইরফান আহমদ তার ‘ইসলামিজম অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ইন ইন্ডিয়া: দ্য ট্রান্সফরমেশন অব জামায়াতে ইসলামী’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামী হিন্দ কালক্রমে সেক্যুলার গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছায়। একই আদর্শ দুই রাষ্ট্রকাঠামোয় দুই রকম রূপ নেয়।
পাকিস্তানে সংঘাত শুরু হতে দেরি হয়নি। ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে মওদূদী গ্রেপ্তার হন; জিন্নাহ তার এক মাস আগেই মারা গেছেন। বিরোধ তখন আর জিন্নাহর সঙ্গে নয়, লীগ সরকার ও উদীয়মান আমলাতান্ত্রিক-সামরিক শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে, যারা ইসলামকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহারে আগ্রহী ছিল, শাসনব্যবস্থা হিসেবে নয়। সবচেয়ে নাটকীয় মোড় আসে ১৯৫৩ সালে। আহমদিয়াবিরোধী আন্দোলনের সময় মওদূদী 'কাদিয়ানি মাসআলা' নামে একটি পুস্তিকা লেখেন। লাহোরে দাঙ্গা ছড়ালে সামরিক আইন জারি হয়, আর সামরিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। দেশে-বিদেশে প্রতিবাদের মুখে দুই দিনের মাথায় ওই দণ্ড যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হয়; ১৯৫৫ সালে তিনি মুক্তি পান। দাঙ্গার তদন্তে গঠিত মুনির কমিশনের প্রতিবেদন এক বিস্ময়কর তথ্য নথিভুক্ত করে: ‘মুসলমান কে’, এই মৌলিক প্রশ্নেই আলেমরা একমত হতে পারেননি। মুসলিম রাষ্ট্র বনাম ইসলামি রাষ্ট্রের বিতর্ক এভাবে জায়গা পায় রাষ্ট্রের সরকারি দলিলে।
আইয়ুব খানের আমলে সংঘাত আরও তীব্র হয়। আধুনিকীকরণের নামে ১৯৬১ সালে জারি হয় মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, যার বিরোধিতায় জামায়াত সরব ছিল। এই বিরোধিতা আর সরকারবিরোধী অসন্তোষ উসকে দেওয়ার অভিযোগে ১৯৬৪ সালে জামায়াতকে বেআইনি সংগঠন ঘোষণা করে নিষিদ্ধ করা হয়, মওদূদী আবার কারাগারে যান; তবে সুপ্রিম কোর্ট সংগঠন করার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের যুক্তিতে ওই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে।
এর পরপরই ঘটে সেই ঘটনা, যা মওদূদীর রাজনৈতিক বাস্তববাদকে সবচেয়ে স্পষ্ট করে তোলে। আইয়ুবের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধী দল প্রার্থী করে জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহকে, আর জামায়াত তাকে সমর্থন দেয়। নারীর রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া নিয়ে আগের আপত্তি সত্ত্বেও মওদূদী একে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির প্রয়োজন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। যে জিন্নাহর রাজনীতির বিরোধিতা দিয়ে জামায়াতের যাত্রা, ওই জিন্নাহর নাম তখন সামরিক শাসনবিরোধী লড়াইয়ের হাতিয়ার।
মওদূদী কখনো ক্ষমতায় যাননি, নির্বাচনেও তার দল উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি; ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জামায়াতের ফল ছিল হতাশাজনক। পরের বছর, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান যখন ভাঙনের মুখে, তখন যে রাষ্ট্রের জন্ম মওদূদী চাননি, তার অখণ্ডতা রক্ষায় তার নেতৃত্বাধীন জামায়াত সক্রিয় অবস্থান নেয়, যে ভূমিকা বাংলাদেশে আজও গভীর ক্ষোভ ও বিতর্কের বিষয়।
আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী মনে হলেও মওদূদীর যুক্তি ছিল তার পুরোনো অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল ভাষা ও জাতিসত্তাভিত্তিক সেই জাতীয়তাবাদ, যাকে তিনি বরাবর ইসলামের পরিপন্থী মনে করেছেন; আর পাকিস্তান, যত ত্রুটিই থাকুক, ছিল এমন এক রাষ্ট্র, যাকে ইসলামি রাষ্ট্রে রূপান্তর সম্ভব বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। জাতীয়তাবাদের প্রতি যে আপত্তি তাকে পাকিস্তান আন্দোলন থেকে দূরে রেখেছিল, ওই আপত্তিই ১৯৭১ সালে তাকে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে দাঁড় করায়।
ভোটের রাজনীতিতে দুর্বলতা সত্ত্বেও পাকিস্তানের ইসলামীকরণে তার চিন্তার প্রভাব অসামান্য। ওই চিন্তার কেন্দ্রে ছিল কয়েকটি ধারণা: সার্বভৌমত্ব কেবল আল্লাহর (হাকিমিয়াত), মানুষ ওই সার্বভৌমত্বের আমানতদার প্রতিনিধি (খিলাফত), আর রাষ্ট্র হবে এমন এক কাঠামো, যাকে তিনি নিজেই নাম দিয়েছিলেন ‘থিও-ডেমোক্রেসি’, অর্থাৎ জনগণের অংশগ্রহণ থাকবে, তবে শরিয়ার সীমার ভেতরে। তার লেখা ও বক্তৃতার সংকলন ‘ইসলামিক ল অ্যান্ড কনস্টিটিউশন’-এ এসব ধারণা গুছিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে; সংকলনটি সম্পাদনা করেছিলেন তার অনুসারী খুরশিদ আহমদ। ১৯৪৮ সালের শুরুতেই তিনি এগুলোকে চার দফা দাবিতে রূপ দেন: সার্বভৌমত্ব আল্লাহর, শরিয়া হবে রাষ্ট্রের মৌলিক আইন, শরিয়াবিরোধী আইন বাতিল হবে, আর রাষ্ট্রক্ষমতা চলবে শরিয়ার সীমার মধ্যে। পরের তিন দশকের সাংবিধানিক বিতর্কের কাঠামো কার্যত এই চার দফাই তৈরি করে দেয়।
কিন্তু এই দাবিগুলোকে সংবিধান আর আইনে রূপ দিলেন কারা? মূলত তারাই, যারা নিজেরা ইসলামবাদী ছিলেন না, এবং যাদের অনেকে মওদূদীকে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন। ১৯৪৯ সালের মার্চে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের উত্থাপিত উদ্দেশ্য প্রস্তাব (অবজেক্টিভস রেজোলিউশন) গণপরিষদে গৃহীত হয়। এতে ঘোষিত হয়, সার্বভৌমত্ব আল্লাহর, আর রাষ্ট্র জনগণের মাধ্যমে ওই কর্তৃত্ব প্রয়োগ করবে পবিত্র আমানত হিসেবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ওয়ালি রেজা নাসর একে মওদূদীর ধারণার প্রতিধ্বনি হিসেবে দেখেছেন। মওদূদী তখন জেলে। ১৯৫৬ সালের সংবিধান দেশটিকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ ঘোষণা করে। আধুনিকতাবাদী সামরিক শাসক আইয়ুব খান ১৯৬২ সালের সংবিধানে ইসলামি আদর্শবিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের বিধান রাখলেও দেশের নাম থেকে ‘ইসলামিক’ শব্দটি বাদ দিয়েছিলেন। তবে চাপের মুখে পরের বছরই তা ফিরিয়ে আনেন।
এই আপসের যুক্তিটি বোঝা দরকার। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী জন্মলগ্ন থেকেই বৈধতার সংকটে ভুগেছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বদলে রাষ্ট্র চালিয়েছে আমলাতন্ত্র ও সেনাবাহিনী, আর কেন্দ্রকে সামলাতে হয়েছে প্রদেশগুলোর ক্ষোভ, বিশেষত পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি। গণতান্ত্রিক বৈধতার ঘাটতি পূরণের সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল ধর্ম, আর তার কারণ নিহিত রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতেই। মুসলমান পরিচয়ই ছিল পাকিস্তানের অস্তিত্বের একমাত্র যুক্তি; ভাষা, জাতিসত্তা আর ভূগোলে বিভক্ত দেশটিকে এক সুতোয় বাঁধার মতো আর কোনো সাধারণ সূত্র শাসকদের হাতে ছিল না। প্রকৃত গণতন্ত্রের পথে হাঁটলে ক্ষমতা যেত সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির হাতে, যা পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক শাসকগোষ্ঠী কখনো মেনে নেয়নি। তার ওপর ইসলামের নামে গড়া রাষ্ট্রে কোনো শাসকই প্রকাশ্যে ইসলামভিত্তিক দাবির বিরোধিতার ঝুঁকি নিতে পারতেন না।
ইসলাম দিয়ে বৈধতা পেতে চাইলে ওই বৈধতার মানদণ্ড ঠিক করার নৈতিক কর্তৃত্ব আপনা-আপনি চলে যায় ইসলামবাদী দলগুলোর হাতে। রাষ্ট্র কতটা ‘ইসলামি’, ওই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সবচেয়ে সুসংবদ্ধ তাত্ত্বিক কাঠামো গড়েছিলেন মওদূদী, আর তার রাজনৈতিক বাহক ছিল তার দল জামায়াত। ফলে শাসকরা যতবার ইসলামের দোহাই দিয়েছেন, ততবারই জামায়াতসহ ইসলামবাদী দলগুলো হয়ে উঠেছে তাদের কাজের বিচারক। জামায়াত কখনো শাসকের বিরোধী থেকেছে, কখনো মিত্র, কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই প্রতিটি ছাড়ের পর দাবির মাত্রা বেড়েছে, আর পরের শাসককে শুরু করতে হয়েছে আগের জায়গা থেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে। প্রতিটি ছাড় আলাদাভাবে ছোট মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সেগুলো সম্মিলিতভাবে রাষ্ট্রের চরিত্রই বদলে দিয়েছে।
এই ধারার সবচেয়ে জোরাল দৃষ্টান্ত জুলফিকার আলী ভুট্টো। তার দলের ঘোষিত দর্শনে ইসলাম ছিল বিশ্বাস, আর অর্থনীতির ভিত্তি সমাজতন্ত্র; ব্যক্তিজীবনে ও রাজনীতিতে তিনি ইসলামবাদী ধারা থেকে দূরেই ছিলেন। তবু তার আমলে প্রণীত ১৯৭৩ সালের সংবিধানেই প্রথমবারের মতো ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়। এক বছর পর তার সরকার আরও এক ধাপ এগিয়ে দ্বিতীয় সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে আহমদিয়া সম্প্রদায়কে সাংবিধানিকভাবে অমুসলিম ঘোষণা করে। একুশ বছর আগে যে দাবির আন্দোলনে জড়িয়ে মওদূদী মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন, ওই দাবি এবার সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করলেন ধর্মনিরপেক্ষ বলে পরিচিত এক শাসক।
১৯৭৭ সালে ‘নিজাম-ই-মুস্তফা’ স্লোগানে বিরোধী জোটের আন্দোলন যখন তার গদি টলিয়ে দিচ্ছে, ভুট্টো তখন মদ নিষিদ্ধ করেন এবং রোববারের বদলে শুক্রবারকে সাপ্তাহিক ছুটি ঘোষণা করেন। প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে ছিল ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার তাৎক্ষণিক হিসাব। কিন্তু প্রতিটি আপস রাষ্ট্রের ভেতরে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির জায়গা স্থায়ীভাবে বাড়িয়েছে, কারণ একবার সংবিধান ও আইনে ঢোকা বিধান পরের কোনো শাসক আর ফিরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি নেননি। ভুট্টো নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি; তবে যে ভিত তিনি পোক্ত করে গেলেন, তার ওপরেই দাঁড়ালেন তাকে উৎখাত করা জেনারেল।
১৯৭৭ সালে ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউল হক বৈধতার সংকট মেটাতে ইসলামীকরণকে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। জামায়াত নেতা খুরশিদ আহমদ তার মন্ত্রিসভায় পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পান, সুদমুক্ত অর্থনীতির উদ্যোগ শুরু হয়, ১৯৭৯ সালে জারি হয় হুদুদ অধ্যাদেশ। মওদূদীর চিন্তা এবার কেবল ভাষা হিসেবে নয়, ব্যক্তি ও নীতির মধ্য দিয়ে সরাসরি রাষ্ট্রে প্রবেশ করে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলোতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মওদূদীর মৃত্যু হয়।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের সমান্তরালে চলেছে আরেকটি প্রক্রিয়া: জিন্নাহর পুনর্নির্মাণ। পাকিস্তান গঠিত হওয়ার তিন দিন আগে, ১৯৪৭ সালের ১১ অগাস্ট গণপরিষদে দেওয়া ভাষণে জিন্নাহ ধর্মকে নাগরিকের ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর ওই ভাষণ রাষ্ট্রীয় স্মৃতি থেকে ক্রমে আড়ালে চলে যায়, আর জিন্নাহকে উপস্থাপন করা হতে থাকে ইসলামি রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে। যাকে মওদূদী এমন রাষ্ট্র গড়ার অনুপযুক্ত নেতা মনে করতেন, ওই জিন্নাহর নামই হয়ে উঠল রাষ্ট্রের ইসলামীকরণের পক্ষে বৈধতার সবচেয়ে বড় উৎস।
ইতিহাসের জিন্নাহ আর প্রতীকের জিন্নাহ আলাদা হয়ে গেলেন। পাকিস্তানের জন্ম জিন্নাহর নেতৃত্বে, কিন্তু রাষ্ট্রটি বাস্তবে যা ধারণ করেছে, তাতে মওদূদীর চিন্তার ছাপ অনেক বেশি স্পষ্ট। মওদূদী ও তার দলের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো এখানেই; রাষ্ট্রক্ষমতায় না গিয়েও তারা রাষ্ট্রের আদর্শিক অভিমুখ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই অর্জনের পথ সুগম করেছে পাকিস্তানের বিভিন্ন সময়ের সামরিক ও বেসামরিক শাসকগোষ্ঠী। ইসলামবাদী রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও নিজেদের বৈধতার প্রয়োজনে তারা বারবার ইসলামবাদীদের মুখাপেক্ষী হয়েছেন।
মওদূদী ও জিন্নাহর দ্বন্দ্ব তাই শেষ পর্যন্ত দুই ব্যক্তির দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি ছিল রাষ্ট্রের ভিত্তি প্রশ্নে দুটি ভিন্ন উত্তরের লড়াই; মুসলমানদের রাষ্ট্র, নাকি ইসলামের রাষ্ট্র। পাকিস্তানে ওই লড়াইয়ের মীমাংসা তর্কে বা ভোটে হয়নি; হয়েছে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে। এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি সাধারণ সূত্র বেরিয়ে আসে। যে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক সম্মতির বদলে ধর্মের কাছে বৈধতা খোঁজে, সে অজান্তেই নিজের মাপকাঠি তুলে দেয় তাদের হাতে, যারা ধর্মের ব্যাখ্যায় একচ্ছত্র অধিকার দাবি করে। আর এভাবেই রাষ্ট্রের ভেতরে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির শক্ত ভিত তৈরি হয়।
আজ বাংলাদেশে জিন্নাহকে নিয়ে নতুন করে যে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তা বোঝার জন্যও এই ইতিহাস মনে রাখা জরুরি। জিন্নাহ আর মওদূদী একই রাজনৈতিক ধারার মানুষ ছিলেন না; তাই কোন জিন্নাহকে সামনে আনা হচ্ছে, ইতিহাসের নাকি প্রতীকের, ওই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সাঈদ ইফতেখার আহমেদ: শিক্ষক, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিজ, আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেম। ই-মেইল: sia112002@yahoo.com
আগের পর্ব:
মওদূদী কেন জিন্নাহবিরোধী-১: মুসলমানদের নাকি ইসলামের রাষ্ট্র?
