যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো কিংবা মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলে পুতিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবেন বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়েছে। ট্রাম্প রাশিয়ার জ্বালানি কেনার চুক্তি ঘোষণার পর জেলেনস্কি তাঁকে ‘ইতিহাসের ভুল পক্ষে’ অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ করেন। ওই চুক্তির ফলে রাশিয়াকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পরে ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেন, যা তাঁর নিজ দলেও সমালোচনার জন্ম দেয়। একই সময়ে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান পরিচালিত স্টারলিংক সেবায় ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রবেশাধিকারও সীমিত হয়ে পড়ে।
বৃহস্পতিবার কিয়েভ থেকে সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি তুলনামূলক সমঝোতামূলক সুরে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় নয়। তবে পুতিন যুদ্ধ বন্ধ করতে চান না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
জেলেনস্কি বলেন, ‘পুতিনের বিষয়ে আমার অবস্থান খুবই স্পষ্ট। আমার মনে হয়, আমরা যদি নিষেধাজ্ঞা তুলে নিই, তাহলে তাঁকে আরও শক্তিশালী করে তুলব। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আমার বিষয়টি ব্যক্তিগত কিছু নয়। আর আমি অবশ্যই যেকোনো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিরোধী।’
সাড়ে চার বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে ট্রাম্পের দূতদের নতুন কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই এ মন্তব্য করলেন জেলেনস্কি।
বুধবার রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে পুতিনের সঙ্গে তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ৭৪ বছর বয়সী মার্কিন বন্দি স্টিফেন হাবার্ডকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য পুতিনকে ‘মানবিক’ বলে উল্লেখ করে বিতর্কের জন্ম দেন তিনি। এর আগের দিন নরওয়েতে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন উইটকফ।
বুধবার ট্রাম্প দাবি করেন, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা হলে হাবার্ডের মুক্তি সম্ভব হতো না। সিএনএনের সাংবাদিক কাইটলান কলিন্সের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা কঠোর হলে হাবার্ডের বিষয়ে আর কিছু জানা যেত না; তাঁকে আবার কারাগারে পাঠিয়ে ২৫ বছরের জন্য আটকে রাখা হতো।
ট্রাম্প আরও বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সমঝোতার সম্ভাবনা নষ্ট হতে পারে নিষেধাজ্ঞা কঠোর করলে। তাঁর ভাষায়, ‘যখন আপনি একটি চুক্তির কাছাকাছি থাকেন এবং সংবেদনশীল আলোচনা চলে, তখন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যায় না।’
‘পুতিন মানুষের জীবন নিয়ে খেলছেন’
নরওয়ের রাজধানী অসলোতে উইটকফের সঙ্গে নিজের বৈঠককে ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করেছেন জেলেনস্কি। তবে পুতিন যে শান্তি চান, সে বিষয়ে তিনি এখনো নিশ্চিত নন। উইটকফের সফরের পর পুতিন নভেম্বরে আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছেন, যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
জেলেনস্কি বলেন, ‘পুতিন খেলছেন, বুঝতেই পারছেন, তিনি একজন খেলোয়াড়। এটা দুঃখজনক, কারণ তিনি অন্য মানুষের জীবন নিয়ে খেলছেন। আর অবশ্যই তিনি যুদ্ধ বন্ধ করতে চান না। তাই আমাদের অংশীদারদের কাছে আমরা যা চাই, তা হলো—তাঁকে আরও শক্তিশালী হওয়ার এবং আমাদের পরাজিত করার সুযোগ দেওয়া যাবে না।’
বুধবার ট্রাম্প বলেছিলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানের ক্ষেত্রে তাঁর প্রশাসন এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। তবে ওই রাতেই রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর শত শত ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
এদিকে ইউক্রেনের কাছ থেকে ভূখণ্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে সর্বোচ্চ দাবি বজায় রেখেছে মস্কো। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, এখন বিরোধের মূল কেন্দ্রবিন্দু পূর্ব ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলের অবশিষ্ট অংশের ভবিষ্যৎ। অঞ্চলটির অধিকাংশই বর্তমানে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মতপার্থক্য নিরসনে কিছু ‘সৃজনশীল ধারণা’ সামনে এসেছে বলেও জানান তিনি।
যুদ্ধবিরতির জন্য সম্মুখসারির অবস্থান স্থগিতের প্রস্তাব
সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বর্তমান সম্মুখসারির অবস্থান অপরিবর্তিত রেখে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে ‘হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে আলোচনায় বসা’ সম্ভব হতে পারে।
তবে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি যে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, তা স্পষ্ট করেছেন তিনি। একই সঙ্গে দখল করা অঞ্চলগুলোকে রাশিয়ার ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না কিয়েভ।
জেলেনস্কি বলেন, ‘আমাদের ভূখণ্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর সঙ্গে মানুষের জীবন জড়িত। বিষয়টি কয়েক কিলোমিটারের নয়। এই ভূমি, আমাদের স্বাধীনতা ও দেশ রক্ষায় অনেক মানুষ প্রাণ দিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাময়িকভাবে দখল করা এসব অঞ্চলকে কেউ রাশিয়ার ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না। আমার মনে হয়, রাশিয়া বিষয়টি বোঝে। কেউ যদি না বোঝে, তা দুঃখজনক। তবে সেটি তাদের বিষয়।’
এর আগে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান সীমিত করা, স্টারলিংক সেবা ধীর করে দেওয়া এবং অস্ত্র সরবরাহে বিলম্বের অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছিল কিয়েভ। তবে সম্প্রতি দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
জেলেনস্কি চলতি সপ্তাহের শুরুতে জানিয়েছিলেন, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান আবার চালু হয়েছে। তবে সিএনএনকে তিনি বলেছেন, স্পেসএক্সের সামরিক কাজে ব্যবহৃত উন্নত যোগাযোগসেবা স্টারশিল্ড এখনো পুরোপুরি সচল হয়নি।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প দাবি করেন, ইলন মাস্ক ইউক্রেনের জন্য সামরিক কাজে ব্যবহৃত স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবার প্রবেশাধিকার পুনরুদ্ধার করেছেন। তবে তিনি নিজে এ বিষয়ে অনুরোধ জানিয়েছিলেন কি না, সে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি।
ইউক্রেনের কয়েকটি সামরিক ইউনিট জানিয়েছে, সেবা পুনরুদ্ধারের পর ইন্টারনেটের গতি বেড়েছে। তবে এ বিষয়ে অবগত একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, সব জায়গায় পরিস্থিতি একই নয় এবং গতিও সীমাহীন নয়। সূত্রটির ভাষায়, ‘জেটচালিত ড্রোন প্রতিহত করার জন্য এটি স্পষ্টতই যথেষ্ট নয়।’ পরিস্থিতি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তথ্য ও ব্যাখ্যার অপেক্ষায় রয়েছে ইউক্রেন। তবে এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সূত্রটি।
এদিকে প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্র সংকটে রয়েছে ইউক্রেন। ফলে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কবার্তা পেলেও সেগুলো ভূপাতিত করার মতো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র দেশটির হাতে নেই।
বৃহস্পতিবার পরে জেলেনস্কি জানান, ফিনল্যান্ড ইউক্রেনকে ৩০ কোটি ইউরো বা ৩৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের নতুন সহায়তা প্যাকেজ দিচ্ছে। দুই দেশ আরও ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করতেও সম্মত হয়েছে। এর আওতায় ইউক্রেন ফিনল্যান্ডের স্যাটেলাইট সক্ষমতা আরও বেশি ব্যবহার করবে।
ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেত্তেরি অরপোর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জেলেনস্কি বলেন, ‘আমাদের সরবরাহব্যবস্থা ও জ্বালানি খাতে সহায়তা দিতে আগ্রহী হওয়ায় ফিনল্যান্ডকে ধন্যবাদ। রাশিয়ার হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এখন এসব খাত। আরও বেশি লোকোমোটিভ, জ্বালানি সরঞ্জাম এবং জ্বালানি অবকাঠামো সুরক্ষার উপকরণ পেলে তা সত্যিই বড় পরিবর্তন আনবে।’
জেলেনস্কি আরও বলেন, ইউরোপীয় মিত্ররা ইউক্রেনকে কিছু আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র দিলেও আত্মরক্ষার জন্য তা যথেষ্ট নয়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের মতে, মিত্রদের কাছ থেকে এখন প্রধানত দুটি জিনিস প্রয়োজন তাদের—‘পুতিনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা এবং আমাদের আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়া।’
সূত্র: সিএনএন
এমএস/
