চলনবিল-অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় হেমন্তের পরশ লাগতেই প্রকৃতিতে বইতে শুরু করেছে শীতের আগাম বার্তা। প্রতিবছরের মতো এবারও শীত মৌসুমে তাড়াশের সুমিষ্ট খেজুর রস ও ভেজালমুক্ত গুড়ের চাহিদা মেটাতে তৎপর হয়ে উঠেছেন গাছিরা। এলাকায় নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে এই গুড় সরবরাহ করা হয় দেশের নানা প্রান্তে। তাই রস আহরণের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে এখন থেকেই পুরোদমে শুরু হয়েছে খেজুরগাছের ডালপালা ছাঁটা, গাছ চাঁচা, চুঙ্গি লাগানো এবং হাঁড়ি ঝোলানোর কাজ।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, তাড়াশ উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার খেজুরগাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে প্রতিবছর প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন রস সংগৃহীত হয়। সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় ৩৫ থেকে ৪০ মেট্রিক টন দানাদার ও পাটালি গুড়, যার চাহিদা দেশজুড়ে রয়েছে।
সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয় গাছিদের পাশাপাশি রাজশাহী জেলার বাঘা ও চারঘাট এবং নাটোরের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম ও সিংড়া উপজেলা থেকে আসা প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি বহিরাগত গাছির দল তাড়াশে ডেরা বেঁধেছেন। তারা শীতের মৌসুমে রস সংগ্রহের জন্য খেজুরগাছ মালিকদের কাছ থেকে চুক্তি নেন। সাধারণত মৌসুম শেষে গাছপ্রতি চার কেজি গুড় দেওয়ার বিনিময়ে এসব গাছ লিজ নেওয়া হয়। চুক্তি সম্পন্ন করার পর হেমন্তের শুরুতেই গাছিরা নেমে পড়েন চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে।
উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়নের উত্তর মথুরাপুর গ্রামের গাছি নাইম ইসলাম বলেন, ‘এ বছর হেমন্তের শুরুতেই বেশ ঠাণ্ডা অনুভূত হচ্ছে; তাই আমরা আগাম প্রস্তুতি হিসেবে গাছ পরিচর্যা শুরু করেছি। তাড়াশের খাঁটি ও ভেজালমুক্ত খেজুর রস এবং গুড়ের সুনাম রয়েছে। আমরা চেষ্টা করি পুরোপুরি স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে রস ও গুড় বাজারজাত করতে, যাতে ক্রেতারা প্রতারিত না হন।’
এদিকে তাড়াশের খেজুর রস ও গুড়ের মান ধরে রাখতে তৎপর রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ। তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মীষ্ঠা সেন গুপ্তা জানান, ‘শীত মৌসুমে এই উপজেলায় খেজুরের রস থেকে বিপুল পরিমাণ মানসম্পন্ন গুড় তৈরি হয়। উপজেলা এবং বাইরে থেকে আসা গাছিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। গুড় তৈরির স্থান ও প্রক্রিয়াগুলো কৃষি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হয়। কোনো ধরনের ভেজাল যেন না মিশতে পারে, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হয়। এ কারণেই তাড়াশের খেজুর গুড়ের কদর সারাদেশে অন্যরকম।’
প্রকৃতির নিয়মে শীতের আমেজ যত গভীর হবে, তাড়াশের গ্রামীণ মেঠোপথ আর গাছিদের ঘরে ঘরে ততই জমাট বাঁধবে খেজুর রস ও খাঁটি গুড় তৈরির উৎসব।
