‘বন্ধুত্বের বন্ধনে বর্ণিল ৬২’ শিরোনামে পাবনার চাটমোহর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পুনর্মিলনী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকাল থেকে দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
সকাল থেকেই সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। একে একে সবাই নিবন্ধন সম্পন্ন করেন।
১৯৬৯ সালের ব্যাচ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাচের সাড়ে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী উৎসবে অংশ নেন। বিদ্যালয়ের কমলা রঙের পোশাকের স্মৃতি ধরে রাখতে সাবেক ছাত্রীরা কমলা রঙের শাড়ি পরেন। বর্ণিল সাজে সাজানো হয় বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে পুরো প্রাঙ্গণ। রঙিন বেলুন ও ঘুড়ি দিয়ে সাজানো হয় স্কুল চত্বর। দীর্ঘদিন পর প্রিয় সহপাঠীদের কাছে পেয়ে অনেকে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে খোঁজখবর নেন।
জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি পৌর সদরের প্রধান সড়ক ঘুরে আবার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়।
এরপর শুরু হয় আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা। এ সময় বিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য অতিথি ও শিক্ষক বক্তব্য দেন।
এরপর শুরু হয় স্মৃতিচারণ পর্ব। বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রীরা তাঁদের স্মৃতিবিজড়িত বিদ্যালয়, শিক্ষক এবং সহপাঠীদের সঙ্গে কাটানো পুরোনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করেন। এ সময় অনেকে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে শিক্ষকদের সম্মাননা জানানো হয়। পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বর্ণিল এ আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ১৯৮১ ব্যাচের সাবেক ছাত্রী দেলোয়ারা খাতুন বলেন, আমার বাবা ১৫ বছর এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। এই স্কুলটি আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিযে এসেছে। মনে হয় সেই সিক্সে ভর্তি হই। সেইদিনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে খুব। আমি চাই এই স্কুল থেকে শিক্ষার যে আলো নিয়ে আমার জীবন গড়েছি। সেই আলো জ্বলে থাকুক আজীবন। পরবর্তী প্রজন্ম সেই আলোর ধারায় চলতে থাকুক।
১৯৭২ ব্যাচের সাবেক ছাত্রী নুর জহান বেগম বলেন, আমি সেই ৭২ সালের ছাত্রী। তখন স্কুলের তেমন কিছুই ছিল না, টিনের ঘরে ক্লাস হতো। আর এখন এসে স্কুল কে চিনতে পারিনি। ৭২ ব্যাচের আমি একমাত্র এসেছি আর কাউকে দেখতে পাইনি। আমার প্রিয় স্কুলে আসতে পেরে আমি আবেগ আপ্লুত।
১৯৮২ ব্যাচের ছাত্রী জোছনা রানী কর্মকার বর্তমানে সাঁথিয়ার রূপসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। তিনি বলেন, আমাদের ব্যাচে ৪০ জন ছাত্রী ছিলাম। এতদিন পর প্রিয় স্কুলে আসতে পেরে আমরা খুব খুশি। স্যারেরা আমাদের যে পরিমাণ আদর ভালবাসা দিয়েছেন তা কোনদিন ভুলবার নয়।
১৯৮৬ ব্যাচের সাবেক ছাত্রী ও চাটমোহর মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ফাহিমা খন্দকার পান্না বলেন, ওই সময়ের আমাদের ব্যাচের ১২ জন বান্ধবীর সাথে দেখা হলো। ৩৫ বছর পরে সবার সাথে দেখা হলো। অনেক গল্প স্মৃতি শেয়ার করলাম। সবার খোঁজ খবর জানলাম। অনেক ভাল লাগলো। সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরে গিয়েছিলাম। পুরোনো চারজন স্যার ম্যাডামের সাথে দেখা হলো।
১৯৯৭ ব্যাচের সাবেক ছাত্রী গুলশান আরা ইসলাম বলেন, অলোক স্যারের সাথে দেখা ২০ বছর পরে। স্যার দোয়া করলেন, অনেক কথা হলো। আমি অলোক স্যারের ছাত্রী। আমার ছেলেকেও স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়িয়েছি। আমার ছেলে এখন অস্ট্রেলিয়া থাকে।
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অলোক কুমার কুন্ডু বলেন, অনেক বছর পর আমার প্রিয় ছাত্রীদের সাথে দেখা হল। যারা আজকে সবাই অনেক বড় বড় জায়গায় আছে। তাদের ভালোবাসায় আজকে আমার চোখে পানি এসে গেছে। আজকে মনে হল আমি একজন সফল শিক্ষক। আশীর্বাদ করি তারা সবাই যে যেখানে আছে ভালো থাকুক।
বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আরিফা সুলতানা রুমা বলেন, আমরা যে যেখানেই থাকি না কেন এই স্কুলটিতেই আমাদের শেকড় পোঁতা। ২০ থেকে ৩০ বছর পর বান্ধবীদের সাথে সহপাঠীদের সাথে দেখা হল। সবাই মিলে খুব আনন্দ হইহুল্লোড় করলাম। আশা করি এমন পুনর্মিলনের ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।
পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক ও বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আনোয়ারা বেগম বলেন, আমরা চেয়েছি অনেকদিন কারো সাথে কারো দেখা নেই। সবাই একসঙ্গে হয়ে আড্ডা দিবো। আত্মীক সম্পর্কটা যাতে অটুট থাকে সেই লক্ষ্যে এই আয়োজন। আমি এই স্কুলের ছাত্রী ছিলাম, তারপর সরকারি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি, পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করি। তাই আজকে এমন একটি আয়োজন করতে পেরে সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং আমিও খুব খুশি।
এমএ
