Published on
:
2 min read
শুভাশিস সৈয়দ, বড়ঞা
দেবীপক্ষ শুরু হতেই ঢাকে পড়েছে কাঠি। সেই তালেই নিজেদের পরিচিতি গড়ছেন মুর্শিদাবাদের বড়ঞার রাইহাট গ্রামের কাকলি দাস, লক্ষ্মী রায়ন, রিয়া দাসরা। সংসার সামলে কাঁধে ঢাক তুলে প্রতিদিন মহড়া দিচ্ছেন এই সব গ্রামের ছাপোষা মহিলারা। দূরদূরান্ত থেকে অনুষ্ঠানে গিয়ে ঢাক বাজানোর বায়না পেয়েছেন। সেই সঙ্গেই তাঁদের জন্য খুলে যাচ্ছে স্বনির্ভরতার পথ। এই গ্রামে নিমাই দাস ঢাকের প্রশিক্ষণ দেন। মূলত, তাঁর উদ্যোগেই ২০১৭ থেকে সূচনা হয় 'সরস্বতী মাতা উন্নয়ন ঢাক সমিতি'-র। এই দলেই কাকলি-লক্ষ্মীর মতো মহিলাদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন নিমাই। প্রথমে নিজের বাড়ির মহিলাদের নিয়ে গড়েছিলেন এই মহিলা ঢাকিদের দল। সেই দলে ছিলেন লক্ষ্মী। পরে গ্রামের অন্য মহিলারাও সেখানে যোগ দিতে শুরু করেন। এখন তাঁর দলে প্রায় ১০ জন সদস্যা রয়েছেন।
হঠাৎ কেন এই ভাবনা? নিমাই বলেন, 'বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতায় গিয়ে দেখতাম মেয়েরা গিটার, বেস ড্রাম বাজাচ্ছে। মনে হয়েছিল, মেয়েরা ঢাক বাজানো শিখলে কেমন হয়? তাই বাড়ির মহিলাদের দিয়ে শেখানো শুরু করি। গ্রামের মেয়েরা যাতে বাড়ির গণ্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্যই এই ভাবনা।' কাকলির কথায়, 'ঢাক বাজিয়ে আমরা মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করতে পেরেছি। ভালোবাসা পাচ্ছি। এটাই বড় আনন্দের। কলকাতা, ভাগলপুর, খড়্গপুর, মেদিনীপুর-সহ অনেক জায়গায় অনুষ্ঠান করেছি।' তাঁর কথায়, 'শুরুর দিনগুলিতে বিষয়টা এতটা সহজ ছিল না। পাড়ার লোকেদের গঞ্জনা শুনতে হয়েছে। অনেকে বদনামও করেছেন। মজার বিষয়, এখন তাঁরাই বলছেন খুবই ভালো কাজ করছি আমরা।' দলের সদস্যা রিয়ার কথায়, 'অনেকেই ভাবেন মেয়েরা শুধু সংসারের কাজ, রান্নাবান্না ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না। আমরা দেখিয়ে দিতে চাই, মেয়েরাও এ সবের ঊর্ধ্বে।' নিমাইয়ের হাতেই দলের সদস্যা লক্ষ্মীর ঢাক বাজানোয় হাতেখড়ি। পরে নিমাইয়ের দলের কথা জানতে পেরে তিনি বড়ঞার কুরুণ্ণারুন থেকে রাইহাটে এসে প্রশিক্ষণ নেন। লক্ষ্মীর কথায়, 'কেউ আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে চাইলে স্বাগত জানাব। শেখানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে অনুষ্ঠানেও সঙ্গে নিয়ে যাব। আমরা আরও এগিয়ে যেতে চাই।'
মহিলা ঢাকিদের নিয়ে নিমাইয়ের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি চান তাঁর দলের মহিলারা বিদেশের মাটিতেও তাঁদের প্রতিভা দেখিয়ে আসুক। তাই সদস্যদের পাসপোর্ট করতে দিয়েছেন তিনি। তবে এ বছর ভাগলপুরে গিয়ে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করছে এই সব মহিলা ঢাকিরা। বৃষ্টির কারণে মহড়ায় সামান্য ছেদ পড়লেও অনুশীলনে কোনও খামতি রাখেননি তাঁরা। আলোকসজ্জা, জাঁকজমক কিংবা উৎসবের বিপুল আয়োজনের বাইরে রাইহাটের মাঠে তাই তৈরি হচ্ছে অন্য এক আগমনির সুর। সেই সুরে দেবী দুর্গার আবাহনের সঙ্গে মিশে রয়েছে মেয়েদের আত্মবিশ্বাস, সামাজিক বাধা পেরোনোর চেষ্টা এবং নিজের পরিচয় গড়ে তোলার গল্প।
