১ ঘণ্টা আগে
সর্বশেষ আপডেট: ১ ঘণ্টা আগে
অধ্যাপক ড. আশির আহমেদ
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাপান সফরে আসছেন। এই সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। অবকাঠামো, শিল্প, বিনিয়োগ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতও হতে পারে বাংলাদেশ- জাপান সহযোগিতার একটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেত্র। বিশেষ করে জাপানের প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, জনসংখ্যাভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বাংলাদেশে নতুন হাসপাতাল নির্মাণ, চিকিৎসক নিয়োগ ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংযোজন অবশ্যই জরুরি। কিন্তু আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্ন করা প্রয়োজন: আমরা কি শুধু হাসপাতালের শয্যা বাড়াব, নাকি প্রতিরোধযোগ্য রোগের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজনও কমাব?
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি রোগসহ অনেক অসংক্রামক রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত ও যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে গুরুতর জটিলতা ও ব্যয়বহুল হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি কমানো সম্ভব। সব হাসপাতালে ভর্তি প্রতিরোধ করা যায় না। তবে প্রতিরোধযোগ্য জটিলতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অনেক ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার আগাম শনাক্তকরণ ও ধারাবাহিক পরিচর্যার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
জাপান ও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা: পার্থক্য কোথায়?
জাপান বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘায়ু জনগোষ্ঠীর দেশ। সেখানে গড় আয়ু প্রায় ৮৪ বছর। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রায় ৭৪ বছর। জাপানে সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা চালু রয়েছে ১৯৬১ সাল থেকে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার বড় একটি অংশের ব্যয় মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট চলতি স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ব্যক্তিগত পকেট থেকে আসে, যা অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক চাপ।
জাপানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম শিক্ষা হলো, চিকিৎসা শুধু অসুস্থ হওয়ার পর শুরু হয় না। কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা, বয়সভিত্তিক স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন, স্বাস্থ্যবিমার মাধ্যমে সেবা গ্রহণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে দেশটির। বিশেষ করে ২০০৮ সাল থেকে চালু থাকা নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও স্বাস্থ্যপরামর্শ কর্মসূচি ৪০ থেকে ৭৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর বিপাকীয় রোগের ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেয়।
তবে জাপানের ব্যবস্থাও নিখুঁত নয়। বয়স্ক জনগোষ্ঠী বৃদ্ধি, চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও স্বাস্থ্যতথ্য বিনিময়ের সীমাবদ্ধতা তাদের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত জাপানের পুরো ব্যবস্থা অনুকরণ করা নয়; বরং গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা থেকে কার্যকর পদ্ধতিগুলো গ্রহণ করে বাংলাদেশের বাস্তবতায় উপযোগী একটি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
বাংলাদেশের অবকাঠামো আছে, প্রয়োজন কার্যকর সংযোগ
বাংলাদেশের একটি বড় শক্তি হলো, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো একেবারে নতুন করে তৈরি করতে হবে না। দেশে প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মী আছেন, নিয়মিত ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে এবং স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩-এর মতো টেলিফোনভিত্তিক পরামর্শসেবা ও চালু রয়েছে।
তারপরও সাধারণ মানুষের জন্য সময়মতো মানসম্মত সেবা পাওয়া অনেক ক্ষেত্রে কঠিন। সমস্যাটি কেবল অবকাঠামোর ঘাটতি নয়; বরং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রেফারেল ও রোগীর তথ্যের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব ।
ধরা যাক, গ্রামের একজন মানুষের উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হলো। এরপর কী ঘটবে? তিনি কি চিকিৎসকের পরামর্শ পাবেন? প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ করবেন? এক মাস পর তার রক্তচাপ আবার পরীক্ষা হবে? অবস্থার অবনতি হলে তিনি কি যথাযথ হাসপাতালে পৌঁছাবেন? আর চিকিৎসা শেষে গ্রামের স্বাস্থ্যকর্মী কি জানতে পারবেন তার পরবর্তী করণীয় কী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই লুকিয়ে আছে একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি।
আগাম ঝুঁকি শনাক্তকরণ, যথাযথ রেফারেল সম্পন্ন করা এবং ধারাবাহিক ফলোআপ—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।
তিন বছরে কীভাবে পরিবর্তন সম্ভব?
বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হতে পারে আগামী তিন বছরে বিদ্যমান স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সঙ্গে ডিজিটাল প্রতিরোধমূলক সেবা সংযুক্ত করা।
প্রথম বছরে নির্বাচিত ইউনিয়নে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। স্বাস্থ্যকর্মীদের হাতে স্বল্পমূল্যের নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল চিকিৎসা সরঞ্জাম, রোগীর ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্যরেকর্ড এবং চিকিৎসকের সঙ্গে দূরবর্তী পরামর্শের ব্যবস্থা দিতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য অগ্রাধিকারভিত্তিক স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করে প্রতিটি মানুষের একটি স্বাস্থ্য প্রোফাইল তৈরি করা সম্ভব।
দ্বিতীয় বছরে সফল মডেলগুলো উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। রোগীকে কোথায় পাঠানো হলো, তিনি সেখানে পৌঁছালেন কি না, কী চিকিৎসা পেলেন এবং পরবর্তী ফলোআপ হলো কি না—এসব তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
তৃতীয় বছরে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির ড্যাশবোর্ড তৈরি হলে সরকার বুঝতে পারবে, কোথায় কোন রোগ বাড়ছে, কোথায় স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজন বেশি এবং কোন এলাকায় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিন বছরে পুরো দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। কিন্তু একটি কার্যকর, পরিমাপযোগ্য ও সম্প্রসারণযোগ্য প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
বিদেশে চিকিৎসার ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা
বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতি বছর উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারত, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে যান। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বিদেশে চিকিৎসার পেছনে বছরে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার সব প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়। জটিল অস্ত্রোপচার, ক্যানসারের বিশেষায়িত চিকিৎসা এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর সেবার প্রয়োজন থাকবেই। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি রোগ আগেভাগে শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা গেলে কিছু ব্যয়বহুল জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। একইসঙ্গে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার মান ও মানুষের আস্থা বাড়ানো গেলে বিদেশমুখী রোগীর একটি অংশকে দেশেই সেবা দেওয়া যাবে।
এখানে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু সামাজিক ব্যয় হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী কর্মক্ষমতা বাড়ায়, পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় কমায় এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: চিকিৎসকের সময় ও রোগীর প্রয়োজনের মধ্যে সেতুবন্ধন
একজন রোগীর অসুস্থতা, উপসর্গ, পারিবারিক ইতিহাস ও দৈনন্দিন সমস্যার কথা বলার জন্য হয়তো ১০০ মিনিট প্রয়োজন। কিন্তু ব্যস্ত চিকিৎসকের হাতে সেই রোগীর জন্য সময় থাকতে পারে মাত্র কয়েক মিনিট।
প্রশ্ন হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে রোগীর দীর্ঘ কথোপকথন, পূর্ববর্তী পরীক্ষার ফলাফল ও স্বাস্থ্য-ইতিহাস থেকে চিকিৎসকের জন্য এক মিনিটে পড়ার উপযোগী একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করা যায় না?
প্রযুক্তিগতভাবে এটি এখন সম্ভব। ভয়েস-এআই, স্বয়ংক্রিয় কথোপকথন বিশ্লেষণ ও মেডিকেল সামারাইজেশনের মাধ্যমে রোগীর গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ, ঝুঁকি ও চিকিৎসার ইতিহাস সংক্ষেপে উপস্থাপন করা যায়। তবে এআইয়ের তৈরি তথ্যের নির্ভুলতা যাচাই এবং চিকিৎসকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব মানুষের হাতেই থাকতে হবে।
আরও গবেষণার সুযোগ রয়েছে স্বল্পমূল্যে শরীর থেকে স্বাস্থ্যতথ্য সংগ্রহ, কণ্ঠস্বর থেকে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্ভাব্য সংকেত শনাক্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য রেকর্ড বিশ্লেষণ করে রোগের ঝুঁকি পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে। এসব প্রযুক্তি যথাযথভাবে যাচাই করা গেলে বাংলাদেশের মতো সীমিত চিকিৎসকসম্পন্ন দেশে স্বাস্থ্যসেবার দক্ষতা বাড়াতে পারে।
স্বাস্থ্যতথ্য থেকে নতুন গবেষণা ও মানবসম্পদ তৈরি
বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স ও স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করতে আগ্রহী। একটি জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা তাদের জন্য গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
রোগীর পরিচয় শনাক্তকারী তথ্য যথাযথভাবে অপসারণ বা সুরক্ষিত করে, পুনঃশনাক্তকরণের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নৈতিক অনুমোদন নিশ্চিত করার পর স্বাস্থ্যতথ্য গবেষণায় ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে রোগের ভৌগোলিক বিস্তার, ওষুধের কার্যকারিতা, চিকিৎসার ফলাফল, স্বাস্থ্যসম্পদের চাহিদা এবং ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা সম্ভব হবে। পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন তথ্য থাকলে নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি ও ওষুধ আবিষ্কারের গবেষণাও উপকৃত হতে পারে।
তবে স্বাস্থ্যতথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। শুধু নাম ও ঠিকানা মুছে দিলেই সব তথ্য নিরাপদ হয়ে যায় না। শক্তিশালী এনক্রিপশন, অনুমতিভিত্তিক প্রবেশাধিকার, তথ্য ব্যবহারের নিরীক্ষা, নিরাপদ গবেষণা পরিবেশ এবং স্বাধীন তদারকি অপরিহার্য। রোগীর আস্থা নষ্ট করে কোনো ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা টেকসই হতে পারে না।
জাপানের সঙ্গে সাহায্যনির্ভর নয়, দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে স্বাস্থ্যখাতের সহযোগিতাকে শুধু অনুদান বা চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং দুই দেশের সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারকদের নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি বাংলাদেশ-জাপান প্রিভেন্টিভ ডিজিটাল হেলথ পার্টনারশিপ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
প্রাথমিক পর্যায়ে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো মানসম্মত স্বাস্থ্যপরীক্ষার যন্ত্র, সফটওয়্যার, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবা সরবরাহ করতে পারে। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় বাস্তবায়ন, সফটওয়্যার উন্নয়ন, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও সেবা পরিচালনায় অংশ নেবে।
পরবর্তী পর্যায়ে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও স্থানীয় উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যপরীক্ষার যন্ত্র, আনুষঙ্গিক উপকরণ ও নিয়মিত ব্যবহারযোগ্য কনজিউমেবলস উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিনিয়োগ শুরু করা যেতে পারে।
‘মেড ইন বাংলাদেশ’ স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি কি খুব কঠিন লক্ষ্য? মোটেও অসম্ভব নয়। তবে চিকিৎসা সরঞ্জামের মান নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, নিরাপত্তা পরীক্ষা, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এ ধরনের সহযোগিতায় জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো একটি নতুন বাজার, স্থানীয় উৎপাদন অংশীদার ও যৌথ গবেষণার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ পাবে প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, নতুন কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি রপ্তানির সম্ভাবনা।
জাপানে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশে কর্মরত বাংলাদেশি স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি গবেষকদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা কনসোর্টিয়ামও গঠন করা যেতে পারে। এই কনসোর্টিয়াম কম খরচে রোগনির্ণয়,
এআইভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপদ স্বাস্থ্যতথ্য ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কার্যকারিতা নিয়ে যৌথ গবেষণা পরিচালনা করতে পারে।
সুযোগের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও রয়েছে
প্রযুক্তি কিনলেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিবর্তন হবে না। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, চিকিৎসকদের সম্পৃক্ততা, পরীক্ষার নির্ভুলতা, নিয়মিত সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ, ইন্টারনেট সংযোগ ও রোগীর আস্থা—সবই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, একটি প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সেবাটি কীভাবে চলবে। তাই শুরু থেকেই সরকারের বাজেট, স্থানীয় ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্ব, চিকিৎসকের সঙ্গে সংযোগ এবং সেবার ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
সাফল্য পরিমাপ করতে হবে শুধু কতজন মানুষের স্বাস্থ্যপরীক্ষা হলো তা দিয়ে নয়; বরং কতজন ঝুঁকিপূর্ণ রোগী চিকিৎসা পেলেন, কতজনের রেফারেল সম্পন্ন হলো, কতজন নিয়মিত ফলোআপে থাকলেন এবং কতটা প্রতিরোধযোগ্য জটিলতা কমানো গেল—এসব সূচক দিয়ে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর থেকে একটি বাস্তব উদ্যোগ
বাংলাদেশ ও জাপান চাইলে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে একটি যৌথ উদ্যোগের ঘোষণা দিতে পারে, যার লক্ষ্য হবে আগামী তিন বছরে বাংলাদেশের বিদ্যমান প্রাথমিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো ব্যবহার করে একটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সম্প্রসারণযোগ্য প্রতিরোধমূলক ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা মডেল প্রতিষ্ঠা করা।
এর জন্য শুরুতেই বিশাল নতুন অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানো, চিকিৎসকের সঙ্গে রোগীর যোগাযোগ নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি রোগীর চিকিৎসা ও ফলোআপের ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠা করা।
জাপান কয়েক দশক ধরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জনসংখ্যাভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, বাংলাদেশ তা থেকে শিক্ষা নিয়ে অনেক কম সময়ে নিজস্ব মডেল তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের ভবিষ্যৎ শুধু কতগুলো নতুন হাসপাতাল তৈরি হলো, তা দিয়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়; বরং কত মানুষকে সুস্থ রাখা গেল, কত রোগ আগেভাগে শনাক্ত হলো এবং কত পরিবারকে প্রতিরোধযোগ্য চিকিৎসাব্যয় থেকে রক্ষা করা গেল— সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি।
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর সেই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। বাংলাদেশ পেতে পারে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, আর জাপান পেতে পারে স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা ও শিল্প সহযোগিতার একটি দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার।
অধ্যাপক ড. আশির আহমেদ: কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান। গবেষণার ক্ষেত্র: ডিজিটাল হেলথ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বল্পব্যয়ের স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি।
