কালবেলা · সাধারণ
১২ কোটি টাকার সম্পদের হিসাব নিয়ে মামলা গড়াল ১৮ বছরে
১৩/১০/২০২৬

জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ১২ কোটি ৫৫ লাখ টাকার বেশি সম্পদ অর্জন ও দখলে রাখার মামলায় আনিসুর রহমান প্রকাশ ইয়াহিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
একইসঙ্গে তাকে ১২ কোটি ৫৫ লাখ ১ হাজার ৩৫৩ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাকে আরও এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. মিজানুর রহমান এ রায় দেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে অনুপস্থিত থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) রেজাউল করিম রনি কালবেলাকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘মামলায় মোট ১৩ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে অনুসন্ধান ও তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীরা ছিলেন। তাদের সাক্ষ্যের সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে সংগ্রহ করা নথি ও মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সামঞ্জস্য পেয়েছেন আদালত।’
জানা গেছে, ইয়াহিয়া কক্সবাজার টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকার মৃত হাজি নবী হোসেনের ছেলে।
মামলার নথি সূত্র অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী আবাসিক এলাকায় চারতলা বাড়ি, সাততলা অ্যাপার্টমেন্ট এবং লালখান বাজারের এমএম আলী রোডে দশতলা বাণিজ্যিক ভবনসহ বিভিন্ন সম্পদ অর্জন করেন ইয়াহিয়া। এসব সম্পদে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে আয়কর নথিতে ঘোষিত সম্পদের পরিমাণে বড় ব্যবধান পায় দুদক। আদালতের পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে, সম্পদ অর্জনের অর্থের গ্রহণযোগ্য ও সন্তোষজনক বৈধ উৎস দেখাতে পারেননি তিনি।
আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, আসামির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য পরস্পরকে সমর্থন করেছে। গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন, আয়কর নথি, জমির দলিল এবং জব্দ করা অন্যান্য রেকর্ড পর্যালোচনায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এসব প্রমাণের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারায় আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেন আদালত।
জানা গেছে, খুলশী আবাসিক এলাকার ১ নম্বর সড়কের ২৪ নম্বর প্লটে চারতলা বাড়ি, একই এলাকার ৬ নম্বর সড়কের একটি প্লটে সাততলা অ্যাপার্টমেন্ট এবং লালখান বাজারের ৩৩৫ এমএম আলী রোডে দশতলা বাণিজ্যিক ভবনের নির্মাণ ও জমির মূল্য নির্ধারণ করে গণপূর্ত বিভাগ। খুলশীর চারতলা বাড়িতে জমিসহ বিনিয়োগের পরিমাণ ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৭৬ হাজার ৫৬২ টাকা। সাততলা অ্যাপার্টমেন্টে ৪ কোটি ৬৫ লাখ ২০ হাজার ৫৫৯ টাকা এবং লালখান বাজারের বাণিজ্যিক ভবনে ৪ কোটি ৯৫ লাখ ৯ হাজার ২৩২ টাকা। তিনটি স্থাপনায় মোট বিনিয়োগ দাঁড়ায় ১৩ কোটি ২০ লাখ ৬ হাজার ৩৫৩ টাকা।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০০৭-০৮ করবর্ষ পর্যন্ত আয়কর নথিতে ইয়াহিয়া জমি ও গৃহসম্পত্তি খাতে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিন ভবনে নির্ধারিত মোট বিনিয়োগের সঙ্গে ঘোষিত সম্পদের তুলনা করে ১১ কোটি ২৬ লাখ ৪১ হাজার ৩৫৩ টাকার বিনিয়োগ অপ্রদর্শিত থাকার তথ্য পায় দুদক।
এর বাইরে ঢাকার বারিধারায় ৩৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকার একটি ফ্ল্যাট, কক্সবাজার সদরে ১৭ লাখ টাকায় ‘আজকের দেশ-বিদেশ’ পত্রিকার অফিস, টেকনাফে ১৫ লাখ ২০ হাজার টাকায় নাফ ভিউ ফিলিং স্টেশন লিজ এবং বিভিন্ন এলাকায় জমি ও অন্যান্য সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া ৬৫ হাজার টাকায় একটি বন্দুক ও এক লাখ টাকায় একটি পিস্তল কেনার তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে আসে। এসব সম্পদ ও বিনিয়োগের বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়। সব মিলিয়ে ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে ১২ কোটি ৫৫ লাখ ১ হাজার ৩৫৩ টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণভাবে অর্জন ও দখলে রাখার অভিযোগ আনে দুদক।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, খুলশীর চারতলা বাড়িটির মালিকানা আসামি স্বীকার করেছিলেন। অন্য দুটি স্থাপনা শাহপুরী হোল্ডিং লিমিটেডের বলে দাবি করলেও রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য ও সংগৃহীত নথিতে সেগুলোর সঙ্গে আসামির প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা প্রতীয়মান হয়েছে। বারিধারার ফ্ল্যাট ছেলের এবং গাজীপুরের সম্পত্তি অন্যের বলে দাবি করা হলেও সে বিষয়ে পর্যাপ্ত দলিল আদালতে উপস্থাপন করতে পারেননি তিনি।
আসামিপক্ষ পরবর্তী করবর্ষের কিছু আয়কর নথি ও অন্যান্য কাগজপত্র দাখিল করে সম্পদের হিসাবের পক্ষে যুক্তি দেয়। তবে আদালত মনে করেন, পরবর্তী সময়ে আয়কর নথিতে কোনো সম্পদ অন্তর্ভুক্ত করলেই আগের সময়ে তা অর্জনের অর্থের বৈধ উৎস প্রমাণিত হয় না। আয়কর রিটার্নে সম্পদ দেখানোও সেই সম্পদ কেনার অর্থের বৈধ উৎসের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
২০০৮ সালের ১৯ নভেম্বর খুলশী থানায় মামলাটি করেন দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২-এর তৎকালীন সহকারী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম। তদন্ত শেষে ২০০৯ সালের ৫ জুলাই দুদকের সহকারী পরিচালক শেখ আব্দুস সালাম ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে ১২ কোটি ৫৫ লাখ ১ হাজার ৩৫৩ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও দখলে রাখার অভিযোগে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০০৯ সালের ১৭ আগস্ট আদালত অভিযোগ আমলে নেন। পরে ২০১৮ সালের ১৪ মার্চ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗