আল-আকসার শেষ প্রহরী
এক সৈনিকের ৬৫ বছরের আমৃত্যু অপেক্ষা
চ্যানেল আই অনলাইনপ্রকাশ:
কেউ তাকে ভুলে গিয়েছিল। কেউ আর খোঁজ নেয়নি। যে সেনাবাহিনীর হয়ে তিনি অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই সেনাবাহিনীও একদিন ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছে। বদলে গেছে সাম্রাজ্য, বদলে গেছে মানচিত্র, বদলে গেছে পৃথিবী। কিন্তু বদলায়নি একজন মানুষের প্রতিজ্ঞা। পবিত্র আল-আকসা মসজিদের প্রাঙ্গণে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন বছরের পর বছর। একা, নি:সঙ্গ, অবিচল। তার নাম কর্পোরাল হাসান। ইতিহাসে তিনি পরিচিত আল-আকসার শেষ উসমানীয় প্রহরী হিসেবে।
১৯১৭ সাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়। একের পর এক ভূখণ্ড হারাচ্ছে উসমানীয় সাম্রাজ্য। ব্রিটিশ বাহিনী এগিয়ে আসছে জেরুজালেমের দিকে। শত শত বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে পবিত্র নগরী ছাড়তে হচ্ছে উসমানীয় সেনাবাহিনীকে। সৈন্যরা ফিরে যাচ্ছেন নিজ নিজ গন্তব্যে। কিন্তু সেদিন জেরুজালেমে থেকে গিয়েছিলেন কয়েকজন সৈনিক। তাদেরই একজন আনাতোলিয়ার ইগদির অঞ্চলের তরুণ হাসান।
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, জেরুজালেম ছেড়ে যাওয়ার আগে তাদের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট মুস্তফা পবিত্র আল-আকসার নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন এই সৈনিকদের। বলে গিয়েছিলেন, ব্রিটিশরা যেন মনে না করে যে, মুসলিমরা আল-আকসা অরক্ষিত রেখে গেছে। আদেশের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল সেই দায়িত্বের প্রতি তাদের অঙ্গীকার।

হাসান জানতেন না, সেই দায়িত্ব তাকে কত দীর্ঘ এক অপেক্ষার পথে নিয়ে যাবে। জানতেন না, একদিন তার সহযোদ্ধারা সবাই হারিয়ে যাবেন, একে একে স্বাভাবিক মৃত্যু হবে তাদের। জানতেন না, তার যৌবন ফুরিয়ে যাবে, চুল সাদা হবে, শরীর নুয়ে আসবে বার্ধক্যের ভারে। শুধু জানতেন, তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর সেই দায়িত্ব ছেড়ে চলে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।
বছর গড়িয়েছে। দশক পেরিয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটেছে কত উত্থান-পতন। উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আধুনিক তুরস্ক। জেরুজালেমের রাজনৈতিক বাস্তবতা পাল্টেছে বারবার। অথচ আল-আকসার আঙিনায় থেকে গেছেন সেই সৈনিক।
তার সহযোদ্ধারা একে একে মৃত্যুবরণ করেছেন। যাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনি একদিন দায়িত্ব পালন শুরু করেছিলেন, তাদের কেউ আর বেঁচে নেই। অবশেষে থেকে গেছেন শুধু হাসান। একটি হারিয়ে যাওয়া সেনাবাহিনীর শেষ প্রহরী। যেন অতীতের সঙ্গে বর্তমানের এক জীবন্ত সেতুবন্ধ।
১৯৭২ সাল। তুরস্কের সাংবাদিক ইলহান বারদাকচি এসেছেন জেরুজালেমে। আল-আকসা মসজিদের প্রাঙ্গণে ঘুরতে গিয়ে তার চোখ আটকে যায় এক বৃদ্ধের দিকে। বয়স নব্বইয়ের কাছাকাছি। পরনে বহু পুরোনো সামরিক পোশাক। জায়গায় জায়গায় তালি দেওয়া। বয়সের ভার স্পষ্ট তার শরীরে। তবু দাঁড়িয়ে আছেন সোজা হয়ে, ঠিক একজন কর্তব্যরত সৈনিকের মতো।
কৌতূহলী সাংবাদিক এগিয়ে যান। জানতে চান বৃদ্ধের পরিচয়।
বৃদ্ধ নিজের পরিচয় দেন উসমানীয় সেনাবাহিনীর কর্পোরাল হাসান হিসেবে। জানান, তিনি ইগদিরের সন্তান। একসময় যুদ্ধ করেছেন উসমানীয় বাহিনীর হয়ে। জেরুজালেম ছাড়ার সময় তাকে আল-আকসা পাহারার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই দায়িত্ব পালন করতেই তিনি রয়ে গেছেন।
সাংবাদিকের কাছে যেন অবিশ্বাস্য মনে হয় ঘটনাটি। যে সাম্রাজ্যের হয়ে এই মানুষটি দায়িত্ব পালন শুরু করেছিলেন, সেটি বহু আগেই বিলুপ্ত। যে অধিনায়ক তাকে এখানে রেখে গিয়েছিলেন, তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই কয়েক দশক। কিন্তু এই বৃদ্ধ সৈনিকের কাছে দায়িত্বের মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি।
হাসান জানান, তার সঙ্গে আরও সৈনিক ছিলেন। তারা একে একে চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে। যুদ্ধ তাদের সবাইকে কেড়ে নিতে পারেনি, কিন্তু সময় কেড়ে নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত বেঁচে আছেন শুধু তিনি।
কথাগুলো শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তুর্কি সাংবাদিক। অথচ বৃদ্ধ হাসানের মনে তখনো একটি অসমাপ্ত দায়িত্ব। দীর্ঘদিনের জমে থাকা একটি বার্তা তিনি পৌঁছে দিতে চান নিজের অধিনায়কের কাছে।
তিনি সাংবাদিককে অনুরোধ করেন, দেশে ফিরে যদি সম্ভব হয়, তাহলে যেন লেফটেন্যান্ট মুস্তফার খোঁজ নেন। আর তাকে জানান, ইগদিরের কর্পোরাল হাসান এখনো জেরুজালেমে আছেন। যেখানে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেখানেই আছেন। তিনি তার দায়িত্ব ছেড়ে যাননি। অধিনায়কের দোয়া চান তিনি।
কী আশ্চর্য এক অপেক্ষা!
পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কত কিছু বদলে গেছে চারপাশে। অথচ একজন সৈনিক এখনো তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানাতে চান, তিনি আদেশ অমান্য করেননি।
এ যেন কেবল সামরিক শৃঙ্খলার গল্প নয়। এ এক মানুষের বিশ্বাসের গল্প। নিজের দায়িত্বকে জীবনের চেয়েও বড় করে দেখার গল্প। এমন এক ভালোবাসার গল্প, যার জন্য কোনো পুরস্কারের প্রয়োজন হয় না, কোনো স্বীকৃতির অপেক্ষা থাকে না।
হাসানের কথা শুনে সাংবাদিক বারদাকচি তার হাতে চুমু খেয়ে বিদায় নেন। বৃদ্ধের সেই হাত, যে হাতে একসময় ছিল তারুণ্যের শক্তি, এখন সেখানে বয়সের ছাপ। অথচ সেই হাতেই যেন রয়ে গেছে অর্ধশতাব্দীর এক অটল অঙ্গীকার।
তুরস্কে ফিরে সাংবাদিক খোঁজ করেন লেফটেন্যান্ট মুস্তফার। কিন্তু জানতে পারেন, বহু বছর আগেই মারা গেছেন তিনি। যে মানুষটির কাছে হাসান তার কর্তব্য পালনের বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন, তিনি আর পৃথিবীতে নেই।
এই খবরটুকুও হয়তো হাসানের জানা হয়নি।
জেরুজালেমে তখনো তার দিন কাটছে। পবিত্র আল-আকসার আঙিনায় সময় এগিয়ে চলেছে নিজের নিয়মে। নতুন প্রজন্ম আসছে, পুরোনো প্রজন্ম বিদায় নিচ্ছে। হয়তো অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন তার পাশ দিয়ে হেঁটে গেছেন। কেউ জানেননি, এই বৃদ্ধের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক হারিয়ে যাওয়া সাম্রাজ্যের শেষ অধ্যায়।
অবশেষে ১৯৮২ সাল। সাংবাদিক ইলহান বারদাকচির কাছে একটি টেলিগ্রাম বার্তা পৌঁছায়। সংক্ষিপ্ত সেই বার্তার অর্থ ছিল: আল-আকসার শেষ উসমানীয় প্রহরী আর বেঁচে নেই।
শেষ হলো এক দীর্ঘ অপেক্ষা। শেষ হলো এক সৈনিকের নি:সঙ্গ প্রহরা।
কিন্তু সত্যিই কি শেষ হলো?
যে মানুষটি জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন নিজের দায়িত্বের প্রতি অবিচল থেকে, তার গল্প কি মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে যেতে পারে?
কর্পোরাল হাসান কোনো সম্রাট ছিলেন না। ছিলেন না বিখ্যাত সেনাপতি। তার নামে বিশাল কোনো সামরিক বিজয়ের ইতিহাসও লেখা হয়নি। তিনি ছিলেন সামান্য একজন সৈনিক। কিন্তু কখনো কখনো ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা রেখে যান এমনই সাধারণ মানুষেরা।
তার কাছে আল-আকসা ছিল শুধু পাহারা দেওয়ার একটি স্থান নয়। ছিল বিশ্বাস, স্মৃতি আর অঙ্গীকারের প্রতীক। তিনি হয়তো জানতেন, তার একার পক্ষে ইতিহাসের গতিপথ বদলানো সম্ভব নয়। কিন্তু নিজের দায়িত্বের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা সম্ভব। আর সেটুকুই তিনি করে গেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

আজও আল-আকসা মুসলমানদের হৃদয়ে গভীর আবেগ ও পবিত্রতার প্রতীক। জেরুজালেমের ইতিহাসে রয়েছে সংঘাত, বেদনা, বিশ্বাস ও অসংখ্য মানুষের স্মৃতি। সেই দীর্ঘ ইতিহাসের ভেতর কর্পোরাল হাসানের গল্প যেন নি:শব্দে মনে করিয়ে দেয়: সব বীরত্ব যুদ্ধক্ষেত্রের বিজয়ে লেখা হয় না। কিছু বীরত্ব লেখা হয় অপেক্ষায়, ধৈর্যে, দায়িত্বে আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়।
পৃথিবীতে অনেক মানুষ কথা দেন। সময়ের সঙ্গে সেই কথা হারিয়ে যায়। অনেকেই দায়িত্ব নেন, পরিস্থিতি বদলালে সরে দাঁড়ান। কিন্তু কর্পোরাল হাসানের জীবনের প্রচলিত কাহিনি আমাদের সামনে তুলে ধরে এমন এক মানুষের প্রতিচ্ছবি, যিনি নিজের প্রতিশ্রুতিকে আঁকড়ে ছিলেন শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত।
যে অধিনায়ক তাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তিনি আর ফিরে আসেননি। যে সেনাবাহিনীর তিনি সদস্য ছিলেন, সেটিও আর ছিল না। ফিরে আসেনি তার হারিয়ে যাওয়া যৌবন। ফিরে আসেননি তার সহযোদ্ধারা।
শুধু রয়ে গিয়েছিলেন হাসান। একজন বৃদ্ধ সৈনিক। একটি পবিত্র প্রাঙ্গণ। আর বহু দশক ধরে বয়ে চলা এক অঙ্গীকার।
সময়ের কাছে সবাইকে একদিন হার মানতে হয়। কর্পোরাল হাসানও তার ব্যতিক্রম নন। কিন্তু সময় তার জীবনের সেই অঙ্গীকারকে মুছে দিতে পারেনি।
আল-আকসার আঙিনায় আজ আর দাঁড়িয়ে নেই সেই বৃদ্ধ সৈনিক। তবু তার গল্প শুনলে মনে হয়, পুরোনো সামরিক পোশাক পরা একজন মানুষ এখনো যেন ইতিহাসের দরজায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
কেউ তাকে আর দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয় না। কেউ এসে বলে না, তোমার প্রহরা শেষ। কিন্তি ইতিহাস যেন নীরবে উচ্চারণ করে: একটি সাম্রাজ্য চলে গিয়েছিল। একটি সেনাবাহিনী ফিরে গিয়েছিল। কিন্তু একজন সৈনিক তার অঙ্গীকার ছেড়ে যাননি।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
