স্ত্রীর মন ভালো করতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন নূর আলম। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ স্ত্রী ফারিয়া কবিরকে নিয়ে কিছুটা আনন্দের সময় কাটানোর পরিকল্পনা ছিল তার। সঙ্গে ছিল পাঁচ বছরের একমাত্র ছেলে ফাইজান নূর। কিন্তু সেই ভ্রমণই কেড়ে নিল তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলোকে।
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে আগুনের ঘটনায় স্ত্রী, একমাত্র সন্তান, শ্যালক ও তিন শ্যালিকাকে হারিয়েছেন তিনি। এক মুহূর্তে তছনছ হয়ে গেছে তার সাজানো সংসার।
নূর আলম বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বড়াকোঠা ইউনিয়নের গাজীরপাড় গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র মার্কেটিং অফিসার হিসেবে চুয়াডাঙ্গায় কর্মরত। চাকরির সুবাদে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা শহরের দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ায় প্রায় আট বছর ধরে বসবাস করছিলেন।
পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর বুধবার স্ত্রী ফারিয়া ও ছেলে ফাইজানকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় যান নূর আলম। পরদিন ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সঙ্গে তাদের কক্সবাজারে যাওয়ার কথা ছিল। পরে তারা কক্সবাজারে পৌঁছে উখিয়ার ইনানীতে পাটুয়ারটেক সৈকতের কাছের টুপটুপ রিসোর্টে অবস্থান করেন।
তবে কর্মস্থলের জরুরি কাজ থাকায় ১৬ অক্টোবর শুক্রবার নূর আলমকে একাই চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসতে হয়। স্ত্রী-সন্তান ও শ্বশুরবাড়ির স্বজনদের সেখানে রেখে ফেরার সময় তিনি জানতেন না, সেটিই তাদের সঙ্গে শেষ বিচ্ছেদ হতে যাচ্ছে।
পরদিন ১৭ অক্টোবর শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর দেখতে পান তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই জানতে পারেন, সেই আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন তার পরিবারের ছয় সদস্য। স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে হারানোর পাশাপাশি শ্যালক-শ্যালিকাদের মৃত্যুর খবর তাকে গভীর শোকের মধ্যে ফেলে দেয়।
টুপটুপ রিসোর্টের আগুনে নূর আলমের যে ছয়জন স্বজন প্রাণ হারিয়েছেন, তারা হলেন-তার স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩), একমাত্র ছেলে ফাইজান নূর (৫), শ্যালক নাসির উদ্দিন (২৫) এবং তিন শ্যালিকা ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩)।
পাঁচ বছরের ফাইজান ছিল নূর আলম ও ফারিয়ার একমাত্র সন্তান। সন্তানকে ঘিরে তাদের ভবিষ্যতের যে স্বপ্ন ছিল, তা এখন স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। একই দুর্ঘটনায় পরিবারের আরও চার সদস্যকে হারিয়ে শোকের ভার বহন করতে হচ্ছে নূর আলম ও তাদের স্বজনদের।
নূর আলমের বাবা মোহাম্মদ আলী রাঢ়ি জানান, বিয়ের পর নূর আলম স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে কখনো তাদের উজিরপুরের গ্রামের বাড়িতে আসেননি। চাকরির কারণে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় বসবাস করতেন তিনি। অন্যদিকে নূর আলমের শ্বশুরবাড়ি পটুয়াখালীর তালতলীতে হলেও স্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা ঢাকার বনশ্রী এলাকায় থাকতেন।
একটি কর্মজীবী পরিবারের স্বাভাবিক জীবনেই ছিল তাদের বসবাস। স্ত্রীর অসুস্থতার মধ্যে তার মন ভালো করার জন্য ভ্রমণের আয়োজন করেছিলেন নূর আলম। কিন্তু সেই সফর শেষে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ফেরার পরিবর্তে তাকে এখন মেনে নিতে হচ্ছে ছয়জন স্বজনের চিরবিদায়।
গত ১৭ অক্টোবর শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতের কাছে টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। এ ঘটনায় মোট ১০টি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানা গেছে। পাশাপাশি দগ্ধ ছয়জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল বলে জানানো হয়।
দগ্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দিন ও তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান। এ ছাড়া ছিলেন ইসমাইল হোসেন মাসুদ ও তার স্ত্রী মেহেরুন নেসা এবং মান্নান ও সামিদা।
ইসমাইল হোসেন মাসুদ ও মেহেরুন নেসা নিহত ফারিয়া কবিরের মামা ও মামী। তাদের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার দক্ষিণ তেতলিয়া এলাকায়। ফলে দুর্ঘটনাটি নূর আলমের পরিবারের পাশাপাশি তাদের আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও গভীর শোক ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পরিবারের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিহত ছয়জনকে ঢাকায় দাফন করার পরিকল্পনা রয়েছে। একসঙ্গে বেড়াতে গিয়ে যাঁদের ফিরে আসার কথা ছিল, তাদেরই এখন শেষ বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে স্বজনদের।
