বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব, বিশ্বজুড়ে সতর্কবার্তা
চ্যানেল আই অনলাইনপ্রকাশ:
অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন
টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, দুর্বল তথ্যব্যবস্থা ও দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে ব্যর্থতার কারণে বাংলাদেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে হামের প্রাদুর্ভাব। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ২ লাখ ২ হাজার সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২২ হাজার রোগীর শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত হয়েছে। এ সময়ে এ রোগে মারা গেছেন ১ হাজার ১৪৭ জন। মৃতদের ৯৪ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম।
শনিবার (১৭ অক্টোবর ) আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সন্দেহভাজন হামের রোগীর সংখ্যা বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট, টিকা সংগ্রহে বিলম্ব ও নিয়মিত কার্যক্রমে বিঘ্নের কারণে শিশুদের টিকা দেওয়ার হার কমে যায়। ২০২৪ সালে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়ার হার ৯৬ শতাংশ থাকলেও ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৯০ শতাংশে। দ্বিতীয় ডোজের হার ৯৩ থেকে কমে দাঁড়ায় ৮৬ শতাংশে। অথচ হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন।
এ পরিস্থিতিতে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হলেও লাখ লাখ শিশু বাদ পড়ে। এপ্রিল ও মে মাসে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার পর সংক্রমণ কিছুটা কমেছিল। তবে সেপ্টেম্বরে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৯৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়।
টিকাদান কার্যক্রমের ঘাটতির কারণে সিলেটে দুই বছরের আরমান হোসাইন ও ছাতকে নয় মাস বয়সী লাবিবা আক্তারের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আরমানের বাবা আমিন মিয়ার অভিযোগ, তাঁদের দুর্গম গ্রামে সময়মতো টিকা দিতে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আসেননি। ছেলেকে দাফনের পরই তাঁরা স্বাস্থ্যকর্মীদের দেখা পান। লাবিবার পরিবারও জানিয়েছে, টিকা দেওয়ার বিষয়ে তাদের কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
জুন মাসে পরিচালিত আরেকটি স্বাস্থ্য কর্মসূচির তালিকায় একই বয়সী শিশুদের সংখ্যা হামবিষয়ক টিকাদান কর্মসূচির তুলনায় ৪০ লাখ বেশি ছিল। এতে জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক শিশু বাদ পড়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টিকাবিষয়ক উপদেষ্টা মার্ক জিট বলেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্বের প্রতিটি দেশের জন্য বড় সতর্কবার্তা। তার মতে, জরুরি পরিস্থিতিতে সংক্রমণ মোকাবিলার চেয়ে আগেই টিকার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করা সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে টিকা থেকে বাদ পড়া ৩৪ লাখ শিশুকে আওতায় আনতে নতুন কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত টিকাদান জোরদার, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং দুর্গম এলাকার শিশুদের কাছে টিকা পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
এদিকে, ডেঙ্গুর প্রকোপের কারণে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। সিলেটের ১০০ শয্যার শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে রয়টার্সের প্রতিবেদক যাওয়ার দিন ১৭৮ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। হাসপাতালের প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডেই রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিলেন চিকিৎসাকর্মীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি দূর করা এবং প্রতিটি শিশুর জন্য টিকা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, টিকাদানে সামান্য ঘাটতিও বড় জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের হাম ও রুবেলা নির্মূলবিষয়ক জাতীয় যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও মহামারিবিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, প্রস্তুতি যথাযথভাবে নেওয়া না হলে দরিদ্র ও দুর্গম এলাকার শিশুরাই সবচেয়ে বেশি টিকা থেকে বঞ্চিত হয়। শেষ পর্যন্ত তাদেরই এর মূল্য দিতে হয়।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
