সাইফুল আফ্রিদি
'শুক্রবার সকালে নাহিদুর কল দিয়েছিল, বলেছিল দেখা করব। শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুনের ঘটনা শোনার পর যখন ওকে আবার রিং দিলাম, ফোন আর ধরল না! তখনই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠছিল, কেমন জানি সন্দেহ লাগছিল।'
রবিবার বিকেলে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন উখিয়ার পালংখালীতে কর্মরত মোহাম্মদ খালিদ। যশোর মনিরামপুরের মোহনপুর গ্রামের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চাচাতো ভাই নাহিদুর রহমানের সেই শেষ ফোনকলটিই এখন তাড়া করে ফিরছে তাকে।
শুক্রবারের সেই প্রত্যাশার বার্তা শনিবার সকালে পরিণত হয়েছে এক বুক আতঙ্কে, আর রোববার এসে তা ঠেকেছে কক্সবাজার মর্গের হিমশীতল নীরবতায়।
অন্যদিকে প্রিয় স্ত্রীকে হারিয়ে হাসপাতালের মর্গের একপাশে দাঁড়িয়ে নিস্তব্ধ বাকরুদ্ধ ছাত্রদল নেতা ফয়সাল দেওয়ান। স্ত্রীর মরদেহটি কোথায় আছে এখনো জানেন না তিনি। মর্গের সামনে কাঁদছেন তিনিও। বুকচাপা কষ্ট নিয়ে ফয়সাল দেওয়ান আকুতি জানান, " আমার আর হারাবার কিছু নেই। আইনের কাছে আমরা বাঁধা। প্রক্রিয়া শেষে যেন দ্রুত স্ত্রীর মরদেহটা ফিরে পাই। যেন শেষবারের মতো সুন্দরভাবে তাঁকে বিদায় আর দাফন কাজটুকু সম্পন্ন করতে পারি।"
ইনানীর ‘টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্ট’-এ অগ্নিকাণ্ডের পর কেটে গেছে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময়। কিন্তু পরিচয় মিলেনি মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী নাহিদুর রহমান (৪১), তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬) এবং তাদের দুই শিশুকন্যা রুজাইনা ইনায়া (৬) ও সুনাইনা ইহানা(৩) ও ছাত্রদল নেতা ফয়সালের স্ত্রী মুক্তার।
তাই একদিন পরও রিসোর্টের পোড়া ছাইয়ের স্তূপে ফায়ার সার্ভিসকে সঙ্গে নিয়ে এক দল নিখোঁজদের খুঁজছে, অন্য দল হাসপাতালে মর্গের সামনে অপেক্ষা করছে। আর মোবাইল ফোনে আসা একের পর এক কলে বাড়িতে স্বজনদের আশ্বস্ত করতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠছেন। রবিবার মর্গের সামনের বাতাস সেই ফোঁপানির শব্দেই ভারী হয়ে উঠে।
ঢাকা থেকে ছুটে আসা ডলার মাহমুদের পুরো দিনটাই কেটেছে ব্যস্ততা আর আইনি প্রক্রিয়া সামলাতে। তাঁর চাচাতো বোনের মেয়ে তাজিন, তাজিনের স্বামী নাহিদুর রহমান (ট্রেড ভিশন লিমিটেডের কর্মী) এবং তাদের দুই সন্তানসহ পরিবারের ৪ জন নিখোঁজ।
ডলার মাহমুদ বলেন, “চাচাতো বোনের কাছেই বড় হয়েছি আমি, তাই এই বিপদে সবচেয়ে বেশি দায়িত্বটা আমারই। খবর পাওয়ার পর থেকে স্থির থাকতে পারিনি। পোড়া রিসোর্টে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে খুঁজেছি, এখন মর্গে আইনি জটিলতা মেটানোর চেষ্টা করছি। জড়াজড়ি করে শৌচাগার থেকে যে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে আমাদের ধারণা তারাই নাহিদুরের পরিবার।"
একই দৃশ্য ইলিয়াস, রিয়াজ মাহমুদ রিপন ও আমিনুল ইসলামেরও। ফারিহা কবির, তাঁর শিশুসন্তান ফায়িজান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাফিজ তেহামী (জেরিফ), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লায়লা জাহান নাবিলা এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির মিলিতা মেহেজাবিন আলভী ও ইসরাত জাহান মালিহা। এই ৬ ভাগিনা-ভাগ্নের খোঁজে গতকাল থেকে প্রহর গুনছেন তারা।
বাড়ি থেকে বারবার ফোন আসছে, ফোনের এপার থেকে 'কাজ চলছে' বলে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না আমিনুল ইসলাম। তিন বোনের ৬ জন ভাগিনা ভাগনি হারিয়েছেন তিনি।
ফোনের ওপার থেকে স্বজনেরা ভিডিও কলে দেখতে চেয়েছেন মর্গটা। সেটি দেখাতে দেখাতে মর্গের সামনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতদের চাচা রিয়াজ মাহমুদ রিপন।
এদিকে উদ্ধার হওয়া ১০টি লাশের অবস্থা এতটাই বিকৃত যে খালি চোখে কাউকে চেনার উপায় নেই। তাই এই ফোনের সূত্র ধরেই এখন প্রযুক্তির সহায়তায় তদন্তের জটিল জট ছাড়ানোর চেষ্টা করছে প্রশাসন।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানান, নিখোঁজ থাকা ব্যক্তি অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টের ভেতরে ছিলেন নাকি বাইরে ছিলেন, তা নিশ্চিত হতে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও তদন্তকারী দল মোবাইল ফোন নম্বরের নেটওয়ার্ক লোকেশন ও তথ্য বিশ্লেষণ করছে।
এদিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) জানান, নিখোঁজের তালিকায় ১১ জন থাকলেও লাশ উদ্ধার হয়েছে ১০টি। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ধ্বংসস্তূপের সব জায়গা দেখা সম্ভব হয়নি, তা ছাড়া কাঠের তৈরি ওপরের তলাগুলো ভেঙে নিচে পড়ায় কেউ চাপা পড়ে আছেন কি না তা দেখতে নতুন করে তল্লাশি চলছে।
ছুটির আনন্দ আটকে গেছে এক মাসের দীর্ঘ ডিএনএ টেস্টের জটিলতায়। ডিএনএ নমুনা দেওয়া শেষে তবেই মিলবে পোড়া অঙ্গার মৃতদেহের পরিচয়। আর সেই অঙ্গারের পোড়া স্মৃতিই হয়তো তাড়িয়ে বেড়াবে বাবা-মায়ের বাকি জীবন।
