দশ হাতে অস্ত্র। পায়ের নীচে মহিষাসুর। সিংহবাহিনী দেবীর সেই চেনা রূপেই অভ্যস্ত বাঙালি। কিন্তু ত্রিপুরার আগরতলায় দুর্গাবাড়ির পুজোয় ছবিটা একটু আলাদা। এখানে সামনে থেকে দেখা যায় দেবীর মাত্র দু’টি হাত। বাকি আটটি হাত থাকে আড়ালে। রাজন্য আমল থেকে চলে আসা এই ব্যতিক্রমী রীতিই দুর্গাবাড়ির পুজোকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়।
দেবীর এই দ্বিভুজা রূপের নেপথ্যে রাজপরিবারের প্রচলিত এক কাহিনি। জনশ্রুতি, দশভুজা দুর্গার মূর্তি দেখে ভয় পেয়েছিলেন মহারানি সুলক্ষণা দেবী। সেই ঘটনার পরে দেবীর বাকি আটটি হাত আড়ালে রেখে দু’টি হাত দৃশ্যমান এমন প্রতিমায় পুজোর ব্যবস্থা করা হয়। কথিত আছে, রাজা কৃষ্ণকিশোর মানিক্যের উদ্যোগেই এই বিশেষ রূপের প্রচলন। দেবীর স্বপ্নাদেশের কাহিনিও জড়িয়ে রয়েছে এই বিশ্বাসের সঙ্গে।
ইতিহাস আর লোকবিশ্বাসের মেলবন্ধনে তৈরি এই ঐতিহ্য আজও ভক্তদের অন্যতম আকর্ষণ। তবে রানির ভয় পাওয়া কিংবা স্বপ্নাদেশের ঘটনাগুলি মূলত প্রচলিত জনশ্রুতি হিসাবেই পরিচিত। এই রীতির উৎপত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা পেতে রাজপরিবারের নথি, ‘রাজমালা’ এবং মন্দিরের পুরনো দলিলপত্রের অনুসন্ধান জরুরি।
ত্রিপুরার রাজপরিবারের সঙ্গে দুর্গাপুজোর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। রাজন্য আমলে রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার ও উৎসব পালিত হত। দুর্গাবাড়ির পুজোও সেই ঐতিহ্যের ধারক। সময়ের সঙ্গে রাজতন্ত্রের অবসান হয়েছে। বদলেছে রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো। কিন্তু দুর্গাবাড়ির পুজোর বিশেষত্ব হারিয়ে যায়নি।
রাজপরিবারের শাসন আর নেই। নেই রাজদরবারের পুরনো জৌলুসও। তবু দেবীর সামনে দাঁড়ালে আজও ধরা পড়ে অতীতের রেখাঙ্কন। দশভুজা দুর্গার পরিচিত অবয়বের বদলে দু’টি দৃশ্যমান হাতের প্রতিমার এই বৈশিষ্ট্যই মনে করিয়ে দেয়, একই দেবীকে নিয়ে অঞ্চলভেদে গড়ে উঠতে পারে আলাদা আলাদা আরাধনার রীতি।
বহু ভাষা, জাতিগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির মিলনভূমি ত্রিপুরা। সেই বহুত্বের মধ্যেই বাঙালি সমাজের দুর্গাপুজো রাজ্যের সাংস্কৃতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। আগরতলার দুর্গাবাড়ি তাই শুধু পুজোর স্থান নয়, রাজ্যের ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্যেরও এক পরিচিত ঠিকানা। প্রতি বছর এই বিশেষ প্রতিমা দেখতে ভিড় করেন বহু দর্শনার্থী ও ভক্ত। আজকের দুর্গাপুজোয় থিম, আলোকসজ্জা আর মণ্ডপের অভিনবত্ব নিয়ে নানা প্রতিযোগিতা। সেই আবহে দুর্গাবাড়ির পুজোর আকর্ষণ অন্যত্র। এখানে নতুনত্বের জন্য প্রতিমার রূপ বদলানোর প্রয়োজন হয়নি। বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি বিশেষ রীতিই ধরে রেখেছে পুজোর স্বাতন্ত্র্য।
দেবীর হাতের সংখ্যা এখানে বাহ্যিক পরিচয়ের বিষয়। ভক্তির কেন্দ্রে থাকা দুর্গাই শক্তি, সাহস ও মঙ্গলময়তার প্রতীক। রাজন্য আমল থেকে আজ পর্যন্ত সময়ের বহু পরিবর্তন দেখেছে ত্রিপুরা।
