নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও দাউদপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে শুরু হয়েছে দৌড়ঝাঁপ। ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দুই ইউনিয়নে বাড়ছে নির্বাচনী তৎপরতা। কেউ উঠান বৈঠক করছেন, কেউ বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন। আবার কেউ পোস্টার সাঁটানো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিশেষ করে বিএনপির একাধিক নেতা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করায় দলীয় মনোনয়ন নিয়ে শুরু হয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়েও আলোচনা চলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে মেয়াদ শেষ হওয়ায় রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। বর্তমানে প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নূরনবী ভূঁইয়া। অন্যদিকে দাউদপুর ইউনিয়নেও চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিএনপির একাধিক নেতা। তবে নির্বাচন নিয়ে স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী বাছির উদ্দিন বাচ্চু, ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক নূরনবী ভূঁইয়া এবং উপজেলা যুবদল নেতা আবু মোহাম্মদ মাসুম।
হাজী বাছির উদ্দিন বাচ্চু বলেন, জনপ্রতিনিধি না হয়েও তিনি এলাকাবাসীর জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপুর নির্দেশনায় রূপগঞ্জ ইউনিয়নে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। দিপু ভূঁইয়ার স্বপ্নের রূপগঞ্জ গড়ার অংশীদার হতে চান তিনি। দলীয় সমর্থন পেলে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে অংশ নেবেন।
বাছির উদ্দিন বাচ্চু আরও বলেন, দল থেকে কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা তাঁর নেই। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত রূপগঞ্জ ইউনিয়নবাসীর সেবা করে যেতে চান তিনি।
প্রশাসক নূরনবী ভূঁইয়া বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এলাকার উন্নয়নে কাজ করছেন তিনি। নির্বাচিত চেয়ারম্যান হতে পারলে আরও বেশি উন্নয়নমূলক কাজ করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে সম্মানী ও বেতনের অর্থও এলাকাবাসীর কল্যাণে ব্যয় করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ও রূপগঞ্জ উপজেলা যুবদল নেতা আবু মোহাম্মদ মাসুমও চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে চান। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপির রাজনীতি করতে গিয়ে ৪১টি মামলার আসামি হয়েছেন। জেল-জুলুম ও বাড়িঘরে হামলার শিকার হয়েও দলের সঙ্গে ছিলেন। এ কারণে দলীয় সমর্থন পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী তিনি।
মাসুম বলেন, ভোটারদের দোয়া ও সমর্থন পেতে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইউনিয়নবাসীর পাশে থাকতে চান তিনি। রূপগঞ্জ ইউনিয়নের ভূমিদস্যুতা, মাদক ও সন্ত্রাসের মতো সমস্যা দূর করে এলাকাটিকে আধুনিক ও মডেল ইউনিয়ন হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা তাঁর।
এদিকে রূপগঞ্জ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য আনছর আলী, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন ভূঁইয়া ও ডা. আরমান নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে আনছর আলী বিভিন্ন এতিমখানা, মাদ্রাসা ও মসজিদে সহায়তা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ বজায় রাখছেন বলে জানা গেছে। সাবেক চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন ভূঁইয়া ও তাঁর পরিবারের সদস্যরাও নিজেদের সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব সম্ভাব্য প্রার্থীর নির্বাচনী পরিকল্পনা ও প্রার্থিতা সম্পর্কে তাঁদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে দাউদপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি নেতা মুনতাসির রহমান, নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি সুলতান মাহমুদ, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন সরকার, সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বেলায়েত হোসেন আকন্দ।
স্থানীয়দের একাংশের মতে, মুনতাসির রহমানের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তাঁর সমর্থকদের দাবি, তিনি দলীয় রাজনীতিতে নিজের অর্থ ব্যয় করেছেন এবং স্বচ্ছ রাজনীতি করতে পছন্দ করেন। এলাকার সাধারণ মানুষের পাশে থেকে কাজ করার কারণে তাঁকে চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চান অনেকে।
অন্যদিকে সুলতান মাহমুদের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপির রাজনীতি করার কারণে তাঁকে ৭৭টি মামলার আসামি হতে হয়েছে। দাউদপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়াও এলাকাবাসীর পাশে থেকে উন্নয়নমূলক কাজ করতে চান।
অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন সরকার ও বেলায়েত হোসেন আকন্দ পৃথকভাবে উঠান বৈঠক ও গণসংযোগের মাধ্যমে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। দলীয় সমর্থন পাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জনে তাঁরা তৎপর রয়েছেন।
দাউদপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যুবলীগ নেতা আজিজুল মালুমের নামও আলোচনায় রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর প্রার্থিতার ঘোষণা এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি নেওয়ার কথা স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে রূপগঞ্জ ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির আবু বকর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতার কথা জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে দুই ইউনিয়নে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের প্রকাশ্য নির্বাচনী প্রচারণা এখনো তেমন দৃশ্যমান নয়। অন্যদিকে দাউদপুর ইউনিয়নে এনসিপির উপজেলা সদস্যসচিব সাখাওয়াত হোসেন তারেক চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে পারেন বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে রূপগঞ্জ ও দাউদপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বাড়ছে। উঠান বৈঠক, গণসংযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন তাঁরা।
তবে নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। সচেতন ভোটারদের একাংশের অভিযোগ, একটি পক্ষ প্রশাসক নিয়োগ ও নির্বাচন ছাড়াই ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হওয়ার বিষয়ে তদবির চালাচ্ছে। অন্যদিকে তাঁরা নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চান।
স্থানীয় ভোটারদের প্রত্যাশা, দ্রুত নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হবে এবং সৎ, যোগ্য ও জনবান্ধব প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পাবেন। শেষ পর্যন্ত কারা দলীয় সমর্থন পাবেন এবং ভোটারদের রায়ে কারা নির্বাচিত হবেন, তা নির্ভর করছে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ও প্রার্থী চূড়ান্তকরণের ওপর।
