যেখানেই আমূল পরিবর্তন দরকার, সেখানেই বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’: জামায়াত আমির
জুলাই সনদের সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮ দফা বাস্তবায়নে বেশিরভাগ ভোটার সম্মতি দিলেও তা বাস্তবায়নে বিএনপি সরকার গড়িমসি করছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, সংবিধান মেনে চললে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে কোনো নির্বাচনের অস্তিত্ব থাকে না। ওই নির্বাচন না হলে আপনারা সরকার হন কীভাবে, আর আমরা বিরোধী দল হই কীভাবে? কিছুই তো থাকে না। সংবিধানের এই নেশা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এই সংবিধান ফ্যাসিবাদের জন্মই শুধু দেয় নাই, ফ্যাসিবাদকে স্থায়ী রূপ দিতে চেয়েছিল। যে সমস্ত জায়গায় আমূল পরিবর্তন দরকার, সব জায়গায় আপনারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রেখেছেন। আবার নোট অব ডিসেন্ট দেন নাই, সেগুলোও এখন আপনারা এড়িয়ে চলছেন।
সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা বলেছেন, ফ্যাসিবাদের জন্ম দেওয়া সংবিধানে ফিরে না গিয়ে জুলাই সনদের আলোকে ৭০ ভাগ মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে রাজপথের আন্দোলনেই সরকারকে তা বাস্তবায়নে বাধ্য করা হবে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক আলোচনা সভায় শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন।
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ–সভাপতি আলী রীয়াজসহ কমিশনের সদস্যরাও জুলাই সনদে সই করেন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাতে সই করে।
জুলাই সনদে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের মোট ৮৪ দফা রয়েছে, সংবিধান সংক্রান্ত বিষয় বাদে বাকিগুলোকে ‘আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কার’হিসাবে চিহ্নিত করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮ দফা বাস্তবায়নে জনগণের সম্মতি নেওয়ার জন্য ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটের আয়োজন করা হয়।
শফিকুর রহমান বলেন, ইতোমধ্যেই আপনারা শুনেছেন যে, একই দিনে দুটো ভোট হয়েছে। আমরা কিন্তু একই দিনে চাইনি। আমাদের স্পষ্ট দাবি ছিল, আগে গণভোট হবে, তারপরে সংসদ নির্বাচন হবে। আমাদের আশঙ্কা ছিল, দুইটাকে একসাথে অনুষ্ঠিত করলে দুটাকে গুলিয়ে ফেলা হবে। শেষ পর্যন্ত আমাদের আশঙ্কাই সত্য বলে প্রমাণিত হলো। তারা শুরু থেকেই চাতুর্যের আশ্রয় নিয়েছেন। বিএনপির দাবি ছিল—একই দিনে হোক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই অযৌক্তিক দাবিকে মেনে নিয়ে একই দিনে ভোট করল। জনগণ জানে এবং বলে বিএনপি আসলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়নি। তারা দেশে-বিদেশে ইনস্ট্রাকশন দিয়েছিল তাদের লোকদেরকে ‘না’-তে ভোট দেওয়ার জন্য। জনগণের আকাঙ্ক্ষার কাছে ‘না’ ভেস্তে গেছে, ৭০ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’-তে ভোট দিয়েছে।
জুলাই সনদ সইয়ের অনুষ্ঠানস্থল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই স্বাক্ষর দক্ষিণ প্লাজায় হলো কেন? এটা গণভবনে হলো না কেন? অন্য কোনো জায়গায় হলো না কেন? এটা একটা বার্তা ছিল যে—এই সংসদে বসে বসে জনগণের অধিকারকে খুন করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে। এই সংসদে বসে আগামীতেও যেন একই প্রক্রিয়া চালু না থাকে, এইজন্যই এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—সাধু সাবধান! কিন্তু জাতির সাথে দেওয়া কথা রাখা হলো না। আপনারা ৭০ ভাগ জনগণের সাথে ধোঁকাবাজি করেছেন, আপনারা কি চান বিরোধী দলও ধোঁকাবাজি করুক? আমরা এটা মেনে নেব না।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া শুরুতে হোঁচট খায়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপির বিজয়ীরা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয়ীরা দুই পদেই শপথ নেন।
গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধীদের মাঠের আন্দোলনের মধ্যেই বিএনপি সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন কমিটি করেছে, যেখানে প্রতিনিধি দেয়নি বিরোধীরা।
সংবিধান সংশোধন কমিটি ইতোমধ্যে রাজনীতি দল ও জোট, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক, বিশিষ্ট নাগরিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতা, নারী নেতৃত্ব, গণঅভ্যুত্থানের অংশীজন সঙ্গে বৈঠক করেছে।
আদালত দিয়ে সংবিধান পরিবর্তনের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, ইতিমধ্যেই আইনজীবীরা, আইন প্রণেতারা ও সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ বলেছেন যে এরকম বহুবার সংবিধান সংশোধন হয়েছে, কিন্তু আদালতে গিয়ে এটা পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। আমরা ঐ প্রক্রিয়ায় যেতেই চাই না। আরেকটা সংশোধন করবেন, একটা আদালত এটাকে একদম হোয়াইটওয়াশ করে দিবে। আমরা এই পণ্ডশ্রমে এবং অতীতের ভুল ধারায় চলতে রাজি নই, এইজন্যই আমরা আমূল সংস্কার চাই।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে কল কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের প্রসঙ্গ টেনে গত ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজশাহীর এক জনসভায় বলেন, পরিষ্কার গোয়েন্দাদের তথ্য আছে যে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গিয়েছে তারা সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে। অর্থ সরবরাহ করে তারা কাদের সাহায্যে করছে? এই যে কতগুলা লোক আছে, একটি দল আছে যারা ভ্রান্তি ছড়ায় দেশের মধ্যে, যারা বিভিন্ন টিকিট বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে মিথ্যা কথা বলে এই দুই পক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে।
এ অভিযোগের বিষয়েও মুখ খোলেন বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, তারা (ক্ষমতাসীনরা) নতুন নতুন বয়ান তৈরি করছেন। আমরা নাকি পরিত্যক্ত ফ্যাসিবাদের সাথে হাত মেলাচ্ছি। নাউজুবিল্লাহ। আপনারা নির্বাচনের সময় ইনিয়ে-বিনিয়ে আওয়ামী লীগের কাছে ভোট ভিক্ষা চেয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেছে, ‘হাতে-পায়ে ধরে ভোট নিল, এখন বেঈমানি করে কেন?’ তার দলের আরেকজন গডফাদার বলেছেন, ‘কমপক্ষে ৯৫টি আসনে হেরে যাওয়া বিএনপিকে আমরাই জিতিয়ে দিয়েছি ভোট দিয়ে। আপনার দলের নাটোরের এমপি বলেছেন, ‘আমাদের এই সফলতার পেছনে আওয়ামী লীগের ভাইয়েরা। আমি আওয়ামী লীগকে ধন্যবাদ দেব, আমার দল বিএনপিকে ধন্যবাদ দিতে পারছি না।’ বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাদেরকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এবং আপনাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আপনারা স্থান দিচ্ছেন।
শফিকুর রহমান বলেন, বলতেছেন, সীমান্তের ওপার থেকে টাকা আসে আর এইখানে ইঙ্গিত করে বলেন, আমরা নাকি অস্থিরতা সৃষ্টি করছি। সীমান্তের ওপার থেকে টাকা আসে তো আপনি সরকারে আছেন কেন? এই টাকা ঢুকে কীভাবে, ঠেকাতে পারেন না কেন? ওপার থেকে অস্ত্র আসে, মাদক আসে, কেন ঠেকাতে পারেন না? যেই সরকারের অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়বস্তু ঠেকানোর কোনো যোগ্যতা নাই, সেই সরকারের দেশ শাসন করার কোনো অধিকার নাই।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী একশো-দেড়শো টাকায় লাঞ্চ করেন। ভাই, আরও একটু ভালো করে খান এবং ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেশটাকে চালান। জনগণ আপনাকে ১৫০ টাকায় লাঞ্চ করতে বাধ্য করেনি, কিন্তু জনগণের মুখে দুমুঠো ভাত স্বস্তিতে তুলতে দিন।
দেশের অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, চাঁদাবাজি ও দখলদারির কারণে পঞ্চগড়ে চারটা লাউ এক টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক, অথচ রাজধানীতে তা ৫০-৬০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। রাড্ডার মেডিকেল সেন্টারে রাতের অন্ধকারে ভাঙচুর ও লুটতরাজ চালানো হয়েছে। যে এমপি অপরাধ করলেন তাকে শুধু পদত্যাগ করিয়ে শেষ করা হলো, আইনের আওতায় আনা হলো না। বিএনপির নেতাকর্মীরাও এখন নিজস্ব লোকজনের কাছে চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ।
সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, সংসদে দাঁড়িয়ে তাদের দলেরই এক সিনিয়র সদস্য বলেছেন, মাদকের সবচেয়ে বড় চালান আসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির এলাকা দিয়ে। দিবালোকে চকরিয়ায় ৫০টি ট্রাকে ডাকাতি হচ্ছে। নিজেদের পাহাড়সম ব্যর্থতা চাপা দিতেই বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচারসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে ‘লং মার্চ’ কর্মসূচি শুরু করেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট ১১ দলীয় ঐক্য।
এ কর্বমসূচির প্রসঙ্গ টেনে শফিকুর রহমান বলেন, আমরা আমাদের কোনো দলীয় দাবি বা ১১ দলীয় ঐক্যের কোনো দাবি নিয়ে ময়দানে নামি নাই। আমরা নেমেছি জনগণের অধিকারের দাবি নিয়ে। আগামী লং মার্চ ইনশাআল্লাহ ঢাকা থেকে খুলনা হয়ে কুষ্টিয়া গিয়ে শেষ হবে। এই লং মার্চকে ঘিরে যেন কোনো ষড়যন্ত্র করা না হয়। যদি কোনো ষড়যন্ত্র করা হয়, তাহলে মনে রাখবেন—’৯৮ সালে আওয়ামী ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে যৌথ লং মার্চের কাফেলা, কেউ কেউ সাইনবোর্ডে গিয়ে বসে পড়লেও আমরা অনড় ছিলাম যে এই কাফেলা চিটাগাং যাবে ইনশাআল্লাহ। এবং সব কিছু মোকাবেলা করে সেদিন চিটাগাং গিয়েছিল। আমরাও যেহেতু ন্যায়ের পথে আছি, কোনো ষড়যন্ত্রের কাছে মাথা নত করব না।
বাংলাদেশ জার্নাল/সিএম
