২০২৬ সালের অক্টোবরে ইউরোপজুড়ে তরুণরা রাস্তায় নেমেছে। ফ্রান্সে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে, স্পেনে বাসস্থানের সংকটে লক্ষাধিক মানুষ প্রতিবাদ করেছে, পর্তুগালে লিসবনে হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছেন, ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সহিংস হয়ে উঠেছে, আর আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী আন্দোলন সপ্তম দিনে পৌঁছেছে। বিষয়গুলো ভিন্ন—কোথাও শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা, কোথাও বাসস্থানের মূল্যবৃদ্ধি, কোথাও বা জীবনযাত্রার ব্যয়। কিন্তু মূলে একটি সাধারণ সূত্র রয়েছে: তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশা, রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস, এবং একটি বিশ্বাস যে বিদ্যমান ব্যবস্থা তাদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে ব্যর্থ।
ফ্রান্স: শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও রাষ্ট্রের দমন
ফ্রান্সে বিক্ষোভ শুরু হয় সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ ক্লাসের সময় (সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা—ইউরোপের মধ্যে অন্যতম দীর্ঘ), শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং অস্বচ্ছ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে । শিক্ষকদের অনুপস্থিতি পূরণ না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রায়ই মাসের পর মাস ক্লাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল কঠোর। ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ৬,৬২৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই নাবালক। ৭৬১ জন পুলিশ ও জেন্ডার্মারি, ২১৫ জন শিক্ষার্থী এবং ৮৯ জন শিক্ষক আহত হয়েছেন । একটি ১৫ বছর বয়সী ছেলে স্টান গ্রেনেডে একটি হাত হারায়, আর প্যারিসের উত্তরাঞ্চলে ১৪ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেডে মুখে আঘাত পেয়ে দাঁত হারায় । এই ঘটনার পর পুলিশের স্টান গ্রেনেড ব্যবহার স্থগিত করা হয়।
ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকরনু স্বীকার করেছেন, "তরুণদের ক্ষোভ কোথা থেকে আসছে না, তা নয়" । কিন্তু সরকারের প্রতিক্রিয়া সীমিত—শিক্ষক অনুপস্থিতি পূরণ এবং ভবিষ্যৎ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি, যা বিক্ষোভকারীদের কাছে অপর্যাপ্ত মনে হচ্ছে। ফরাসি ট্রেড ইউনিয়ন CGT বিক্ষোভকে সমর্থন জানিয়েছে এবং জ্বালানির দাম কমানো, পেনশন ও মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে।
স্পেন: এক বৃদ্ধার মৃত্যু যেভাবে জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিল
স্পেনে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় ২৩ সেপ্টেম্বর, যখন ৮৭ বছর বয়সী মারিকামেন আবাস্কাল-কে মাদ্রিদের নিজের বাড়ি থেকে স্ট্রেচারে করে বের করে দেওয়া হয়। তিনি সেখানে ৭০ বছর ধরে বাস করছিলেন। একটি বিনিয়োগ তহবিল তার ভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়, যা তিনি বহন করতে পারেননি । হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুই সপ্তাহ পর, ৭ অক্টোবর তিনি মারা যান।
তার মৃত্যু স্পেনজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। মাদ্রিদের পুয়ের্তা দেল সোল চত্বরে হাজারো মানুষ তাঁবু খাটিয়ে প্রতিবাদ শুরু করে—যা কয়েকদিনের মধ্যে ১,২০০টিরও বেশি তাঁবুর একটি অস্থায়ী শহরে পরিণত হয় । স্পেনের ভাড়া গত এক দশকে ৮০ শতাংশ বেড়েছে। একটি এককক্ষের ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া একটি সম্পূর্ণ গড় বেতনের সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি—ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল মানুষের উচ্ছেদ বন্ধ এবং স্বল্পমেয়াদি ও রুম ভাড়ার নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু парламенте-এ ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক সরকারের জরুরি আবাসন আইন ডানপন্থী দলগুলোর বিরোধিতায় বাতিল হলে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেস ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচন ঘোষণা করতে বাধ্য হন । এটি স্পেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আবাসন সংকটের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
পর্তুগাল: ইউরোপের গড়ের দ্বিগুণ মূল্যবৃদ্ধি
পর্তুগালেও একই দাবিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ১৭ অক্টোবর লিসবনে হাজারো মানুষ মার্চ করেছেন। পর্তুগালের বৃহত্তম ট্রেড ইউনিয়ন CGTP-র আহ্বানে এই বিক্ষোভ হয় । পর্তুগালে ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাসস্থানের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে—যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড়ের প্রায় দ্বিগুণ।
পর্তুগালের মূল্যস্ফীতি সেপ্টেম্বরে ৩.৬ শতাংশ ছুঁয়েছে, খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে। জ্বালানির দাম বছরে ১৫ শতাংশ বেড়েছে মধ্যপ্রাচ্যে tensions বৃদ্ধির পর । ২৬ বছর বয়সী পিএইচডি গবেষক ক্যারোলিনা ক্রুজ সাংবাদিকদের বলেছেন, তার বাড়িভাড়া ৭১৬ ইউরো থেকে বাড়িয়ে ১,২০০ ইউরোর বেশি করা হতে পারে—যা তার আয়ের বাইরে। তিনি বলেন, "আমি আমার পরিবারের প্রথম ব্যক্তি যিনি ডক্টরাল প্রোগ্রামে ঢুকেছি, এবং এত পড়াশোনা করেও আমি পারছি না"।
পর্তুগিজ সরকারের সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস আব্রেউ আমোরিম সতর্ক করেছেন, "সরকার রাস্তার চিৎকারের কাছে নতিস্বীকার করবে না" —একটি বক্তব্য যা সরকার ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ইতালি: মিলান থেকে তুরিন, সহিংসতার ছায়ায়
ইতালিতেও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সহিংস হয়ে উঠেছে। ১৭ অক্টোবর মিলানে ৫,০০০, তুরিনে ৩,০০০, বোলোনিয়ায় ২,০০০ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন । মিলানে মুখোশধারী তরুণরা পুলিশের ওপর পাথর, বোতল ও আতশবাজি ছুড়েছে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও ওয়াটার ক্যানন ব্যবহার করে। ১৪১ জন পুলিশ আহত হয়েছেন, ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের ১২ জন নাবালক । মিলানে দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে; ক্ষতির পরিমাণ ৫,০০,০০০ ইউরোরও বেশি বলে অনুমান করা হচ্ছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, "বিক্ষোভ করা একটি অধিকার। আমাদের শহরগুলোতে আগুন দেওয়া নয়" । কিন্তু সরকারের এই অবস্থান বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি—জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দাম কমানো—সম্বোধন করছে না।
আলবেনিয়া: দুর্নীতি ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে সপ্তম দিন
আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ সপ্তম দিনে পৌঁছেছে। তিরানায় হাজারো তরুণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে জড়ো হয়ে প্রধানমন্ত্রী এদি রামা-র পদত্যাগ দাবি করেছেন । বিক্ষোভকারীরা দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষার নিম্নমান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এই বিক্ষোভের পেছনে আরও একটি কারণ রয়েছে—আলবেনিয়ার দক্ষিণ উপকূলে একটি বিলাসবহুল রিসর্ট নির্মাণের পরিকল্পনা, যার সঙ্গে যুক্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার । স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, তাদের জমি অবৈধভাবে বিক্রি করা হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৫০০ জনকে আটক করা হয়েছে, ১২০ জন পুলিশ ও ৪৫ জন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন।
রামা পদত্যাগ করতে অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, তার সরকার শিক্ষার্থীদের দাবিকে সম্মান করে, কিন্তু "প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার সঙ্গে বৈধ দাবির কোনো সম্পর্ক নেই"।
কেন এই বিক্ষোভ? তিনটি মৌলিক কারণ
প্রথমত, জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট। ইউরোপজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। পর্তুগালে জ্বালানির দাম বছরে ১৫ শতাংশ বেড়েছে । ফ্রান্সে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে । তরুণরা—যারা ইতিমধ্যে কম বেতন ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের মুখোমুখি—তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
দ্বিতীয়ত, বাসস্থানের সংকট। স্পেন, পর্তুগাল ও ইতালিতে বাসস্থানের দাম আকাশচুম্বী। বিনিয়োগ তহবিল ও বিদেশি ক্রেতারা শহরগুলোর আবাসন বাজার দখল করে নিচ্ছেন। স্পেনে ভাড়া এক দশকে ৮০ শতাংশ বেড়েছে । পর্তুগালে ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাসস্থানের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে । তরুণরা নিজেদের শহরে থাকতেই পারছেন না।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস। ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, স্পেনে উচ্ছেদ, পর্তুগালে মূল্যবৃদ্ধি—সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের ব্যর্থতা স্পষ্ট। তরুণরা মনে করছেন, সরকার তাদের সমস্যা বুঝছে না, সমাধানও করছে না। স্পেনের ২৬ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী নান্দো দে আংগুলো-র ভাষায়: "এটি প্রমাণ করে যে বর্তমান অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে আমাদের—জনগণকে, রাজনীতিবিদদের নয়। এটি এভাবে চলতে পারে না"।
রাজনৈতিক পরিণতি: মূলধারার দলগুলোর জন্য সতর্কবার্তা
এই বিক্ষোভ ইউরোপের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা। স্পেনে আগাম নির্বাচন ঘোষণা হয়েছে—যেখানে ডানপন্থী পিপলস পার্টি ও চরম ডানপন্থী ভক্স জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে। ফ্রান্সে চরম ডানপন্থী মারিন লে পেন জরিপে এগিয়ে আছেন। চরম বামপন্থী জঁ-লুক মেলাঁশোঁ ৩৫ বছরের কম বয়সী ভোটারদের ৪৭ শতাংশ সমর্থন পাচ্ছেন।
অর্থাৎ, তরুণদের ক্ষোভ মূলধারার দলগুলো থেকে দূরে সরে চরমপন্থী দলগুলোর দিকে যাচ্ছে। কারণ মূলধারার সরকারগুলো তরুণদের সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে—আর সেই শূন্যতা পূরণ করছে উগ্র ডান ও বাম।
তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে—বেকারত্ব, শিক্ষার মান, বাসস্থানের সংকট। ইউরোপের বিক্ষোভ থেকে শিক্ষা হলো: তরুণদের ক্ষোভ উপেক্ষা করলে তা রাস্তায় নামে, আর সেই ক্ষোভ যদি মূলধারার রাজনীতি শোষণ করতে না পারে, তবে চরমপন্থীরা শোষণ করে। সময়মতো সংলাপ ও সংস্কার না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
