বন অধিদপ্তরে পদায়ন ও বদলিতে ঘুসের নির্ধারিত দর থাকার তথ্য পেয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুই বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদায়নে ৫০ লাখ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৩০ লাখ এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ২০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা ও চেকপোস্টের স্টেশন কর্মকর্তা পদায়নেও রয়েছে নির্ধারিত ঘুসের হার।
এমনকি নির্ধারিত মেয়াদ শেষে নতুন পদায়ন না হওয়া পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মাসিক মাসোহারা দেওয়ারও অভিযোগ পেয়েছে সংস্থাটি। তবে এসব অভিযোগে দেড় বছর আগে অভিযান চালিয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি সংস্থাটি।
বিজ্ঞাপন
এছাড়া পাখি আমদানির আড়ালে শত শত কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। এ অভিযোগে প্রধান বন সংরক্ষকের কার্যালয় থেকে শুরু করে বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশ খতিয়ে দেখা হবে।
বন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ এবং বদলি-পদায়নসহ সার্বিক কার্যক্রমে দুর্নীতির অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বন ভবনে অভিযান চালায় সংস্থাটির এনফোর্সমেন্ট টিম।
বিজ্ঞাপন
অভিযানে প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী, উপপ্রধান বন সংরক্ষক ও টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্পের পরিচালক গোবিন্দ রায়সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুদকের মুখপাত্র ও উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, এসব বিষয়ে দুদকে অনুসন্ধান ও তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।
দুদকের এনফোর্সমেন্ট প্রতিবেদনে বলা হয়, বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন হওয়ার কথা ২০০৪ সালের বদলি-সংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী। তবে বাস্তবে বনাঞ্চলের বিভিন্ন রেঞ্জ, স্টেশন ও বিভাগীয় বন বিভাগকে শ্রেণিভেদে ভাগ করে পদায়নের ক্ষেত্রে ঘুস নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দুই বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির রেঞ্জ কর্মকর্তা পদায়নে ১৫ লাখ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ লাখ এবং তৃতীয় শ্রেণিতে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হতো। এক বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির চেকপোস্টে স্টেশন কর্মকর্তা পদায়নে ২০ লাখ, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ লাখ এবং তৃতীয় শ্রেণিতে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়ার তথ্য পেয়েছে দুদক।
অন্যদিকে, দুই বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদায়নে ৫০ লাখ, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৩০ লাখ এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ২০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন পদায়ন না হওয়া পর্যন্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা, চেকপোস্টের স্টেশন কর্মকর্তা ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের মাসিক মাসোহারা দিতে হতো বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা লঙ্ঘন করে অর্থের বিনিময়ে বদলি ও পদায়ন করা হতো। এ ব্যবস্থার সঙ্গে বন অধিদপ্তরের একটি সিন্ডিকেট জড়িত থাকার তথ্যও অভিযানে উঠে আসে।
বিজ্ঞাপন
বন অধিদপ্তরের দেড় হাজার কোটি টাকার সুফল প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন রয়েছে দুদকে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা রেঞ্জের জোয়ারিয়ানালা বিটে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ৮৭২ হেক্টর এলাকায় নার্সারি ও বনায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
দুদকের এনফোর্সমেন্ট প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫১০ হেক্টর এলাকায় বাগান সৃজনের বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে আনুমানিক ১৬০ হেক্টরে চারা লাগানো হয়েছিল। বাকি এলাকায় বনায়ন না করে শুধু সীমানা নির্ধারণের জন্য দুই সারি চারা লাগানোর অভিযোগ পাওয়া যায়। কোথাও কোথাও চারা রোপণ না করেই বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যেসব এলাকায় বাগান করা হয়েছিল, সেখানেও নিয়মিত পরিচর্যা, আগাছা পরিষ্কার, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ এবং রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি ছিল। ফলে অনেক চারা প্রথম বছরেই মারা যায়। কোনো কোনো এলাকায় বাগানের অস্তিত্ব না থাকলেও সাইনবোর্ডে চারার সংখ্যা ও গাছের প্রজাতির বিবরণ দেওয়া ছিল।
বিজ্ঞাপন
২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরও ৩৬২ হেক্টর এলাকায় বনায়ন ও নার্সারি সৃজনের উদ্যোগেও একই ধরনের অনিয়মের চিত্র পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের জন্য সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়ের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সুফল প্রকল্পের পরিচালক গোবিন্দ রায় ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সুপারিশ করে এনফোর্সমেন্ট প্রতিবেদন দাখিল করে দুদক।
বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে পাখি আমদানির আড়ালে শত শত কোটি টাকা পাচারের অভিযোগেও অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। এ অনুসন্ধানে অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে।
বিজ্ঞাপন
দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, অভিযোগটি অনুসন্ধানের জন্য একজন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা এবং পরিচালককে (মানিলন্ডারিং) তদারককারী কর্মকর্তা নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪, দুদক বিধিমালা, ২০০৭, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা, ২০১৯ অনুযায়ী অনুসন্ধান শেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া অনুসন্ধানকালে অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ বা সম্পদ-সম্পত্তি ক্রোক করা হলে তা তাৎক্ষণিকভাবে কমিশনের সংশ্লিষ্ট শাখাকে লিখিতভাবে জানানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এসএম/ইএ
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
