রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের কৃষক আতাউর রহমান চলতি মৌসুমে ৪৯ বিঘা জমিতে আলু আবাদ করে এখন চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। উৎপাদিত আলু ৬১ কেজির ৫ হাজার ২০০ বস্তায় হিমাগারে সংরক্ষণ করলেও বাজারে দাম পতনের কারণে তিনি লাভের মুখ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচ তোলা নিয়েই গভীর সংশয়ে পড়েছেন। হিমাগার থেকে আলু তোলা পর্যন্ত কেজিতে ৭ টাকা খরচ হলেও বর্তমানে বাজারে দাম নেমে এসেছে মাত্র ১১ থেকে ১৪ টাকায়। ফলে অবশিষ্ট আলু বিক্রি না করে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন এই কৃষক। তার এই দুরবস্থার কথা উল্লেখ করে ভুক্তভোগী চাষিরা দ্রুত সরকারি প্রণোদনা ও বাজার মনিটরিং জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৬ হেক্টর জমিতে রেকর্ড ৫১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৭ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। তবে অঞ্চলের ১২৪টি হিমাগারে সংরক্ষণের সুযোগ মিলেছে মাত্র ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯২ টন, যা মোট উৎপাদনের মাত্র ২৩ দশমিক ১ শতাংশ। সংরক্ষিত এই আলুর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বা ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ (৮ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮ টন) আলু এখনো হিমাগারেই পড়ে আছে। এরই মধ্যে মাঠে নতুন আলুর চাষ শুরু হওয়ায় পুরনো আলুর ওপর চাপ আরও বেড়েছে। ফলস্বরূপ—মজুত, সীমিত সংরক্ষণ ক্ষমতা এবং বাজারে কম দাম—এই তিনমুখী সংকটে পড়েছেন এ অঞ্চলের হাজারো কৃষক ও ব্যবসায়ী।
বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১১ থেকে ১৪ টাকায়। অথচ প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের খরচ এবং হিমাগার ভাড়া মিলিয়ে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে কেজিতে ১৫ থেকে ১৬ টাকা। রংপুর মহানগরীর রঘুবাজার এলাকার কৃষক ভুপাল চন্দ্র রায়সহ স্থানীয় ১৫ জন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হিমাগার ভাড়া বাবদই প্রতি কেজিতে প্রায় ৭ টাকা চলে যাওয়ায় আলু বিক্রি করে কৃষকের হাতে কার্যত মাত্র ৭ থেকে ৮ টাকা থাকে। বর্তমান দরে আলু তুললে শুধু রংপুর অঞ্চলেই কৃষকদের সম্ভাব্য লোকসান ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে দেশের বিভিন্ন বাজারে সবজির ঊর্ধ্বমুখী দামের বিপরীতে রংপুরের খুচরা বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০ থেকে ২২ টাকায় এবং রাজধানী ঢাকায় তা ২৫ থেকে ৩০ টাকায় সীমাবদ্ধ রয়েছে। গত বছরও দাম কম থাকায় কৃষকরা হিমাগার থেকে আলু তোলেননি। বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কায় অনেক চাষি হিমাগার থেকে আলু উত্তোলনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। কৃষি অর্থনীতিবিদ ও প্রান্তিক কৃষকদের মতে, দ্রুত সরকারিভাবে আলুর ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ এবং বিকল্প বাজার ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ না নিলে এই অঞ্চলের আলুচাষিরা সম্পূর্ণরূপে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়বেন।
