রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভের প্রধান মিছিলে পুলিশের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। শহরের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল দিয়ে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত পথ অনুসরণ করে মিছিলটি এগিয়ে যায়। এ সময় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। কয়েকটি জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয় এবং কিছু মেট্রো স্টেশনে চলাচল সীমিত করা হয়।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সরকারি হিসাবের প্রায় দ্বিগুণ। ফলে বিক্ষোভে মোট কত মানুষ অংশ নিয়েছেন, তা নিয়ে সরকারের পরিসংখ্যান ও আয়োজকদের দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা দিয়েছে।
প্যারিসের বাইরেও লিয়োঁ, মার্সেই, লিল, নঁত, তুলুজসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। লিয়োঁতে একটি জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে পুলিশ। অন্যান্য শহরেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিনের শুরুর দিকে প্যারিসের প্রধান মিছিল শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কর্তৃপক্ষের দাবি, আগের সপ্তাহের তুলনায় এবার সহিংসতার মাত্রা কম ছিল। যদিও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিরাপত্তা বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে হয়েছে।
ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পরিচালিত তল্লাশিতে ধাতব বল, আতশবাজি, গুলতি, ধারালো অস্ত্রসহ বিভিন্ন সম্ভাব্য বিপজ্জনক সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিভিন্ন স্থানে আগাম তল্লাশি চালানো হয় এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আটক করা হয়। সরকারের ভাষ্য, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আগের সপ্তাহের মতো লুটপাট ও সরকারি স্থাপনায় হামলার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোই এ কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য।
তবে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা, মিছিলের জন্য নির্ধারিত পথ এবং কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও সমালোচনা দেখা দিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, জনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে তাঁদের প্রতিবাদের সুযোগ সীমিত করা উচিত নয়। অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন, শিক্ষকসংকট নিরসন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নের দাবিকে কেন্দ্র করে এ আন্দোলনের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, সরকারি জনসেবার অবনতি এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে মানুষের অসন্তোষ। বিক্ষোভে শিক্ষার্থী, শ্রমিক, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সদস্য এবং ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও অংশ নেন।
আন্দোলনকারীদের একাংশ মজুরি বৃদ্ধি, সরকারি জনসেবায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সরকারের অর্থনৈতিক নীতিতে পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও অন্যান্য সরকারি সেবার মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য এ বিক্ষোভ নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করেছে। একদিকে অর্থনৈতিক সংকট ও সরকারি সেবার মান নিয়ে জনঅসন্তোষ মোকাবিলা, অন্যদিকে বিক্ষোভের সময় সহিংসতা প্রতিরোধ—দুই ক্ষেত্রেই সরকারকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে।
ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত থাকবে এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের একটি অংশের বক্তব্য, শুধু পুলিশ মোতায়েন ও নিরাপত্তা জোরদার করে চলমান অসন্তোষ দূর করা সম্ভব নয়। জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা, জনসেবা ও সামাজিক বৈষম্যসংক্রান্ত দাবিগুলোরও কার্যকর সমাধান প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভ ফ্রান্সে অর্থনৈতিক চাপ ও জনসেবা নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষের চিত্র তুলে ধরেছে। গ্রেপ্তারের সংখ্যা, বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের হিসাব এবং বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষের ঘটনাপ্রবাহের বিষয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে কী অগ্রগতি হয়, তা দেশটির চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
The post ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভে গ্রেপ্তার ১৩৫, নিরাপত্তায় ৭০ হাজার পুলিশ appeared first on ভোরের চেতনা.
