পরিবারের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ শুধু মুখের কথায় নয়, কাজের মাধ্যমেই ফুটে ওঠে। কখনো কখনো নিজের ব্যক্তিগত ভালোলাগা বা আনন্দকে একপাশে সরিয়ে রেখে পরিবারের আপন মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানোই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র যুগে এমন অনেক নজির তৈরি হয়েছিল, যা চিরকাল পুরো মানবজাতির জন্য অনুকরণীয়। তেমনই এক অনন্য ও হৃদয়ছোঁয়া ঘটনা ঘটিয়েছিলেন তরুণ সাহাবি হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)। নিজের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দিয়ে পিতৃহীন বোনদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য তিনি যে ত্যাগ ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
বোনদের আগলে রাখতে এক তরুণের বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত
উহুদ যুদ্ধের এক আবেগঘন মুহূর্তে হজরত জাবির (রা.)-এর পিতা আবদুল্লাহ (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। শাহাদাতের সময় তিনি সাতটি বা নয়টি ছোট ছোট কন্যাসন্তান রেখে যান। পিতৃহীন বোনদের বিশাল দায়িত্ব এসে পড়ে তরুণ ভাই জাবিরের কাঁধে। বোনদের মানুষ করার গুরুদায়িত্ব নিতে গিয়ে হজরত জাবির (রা.) কোনো কুমারী তরুণীকে বিয়ে না করে এক অভিজ্ঞ ও বয়োবৃদ্ধা (বিধবা) নারীকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন।
পরবর্তীতে আল্লাহর রাসুল (সা.) যখন হজরত জাবির (রা.)-এর বিয়ের খবর শুনলেন, তখন তাদের মধ্যে অত্যন্ত মমতাময় একটি কথোপকথন হয়—
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে জাবির! তুমি কি বিয়ে করেছ?’
হজরত জাবির (রা.) উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, ইয়া রাসুলুল্লাহ!’
রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘কুমারী মেয়েকে বিয়ে করেছ, নাকি কোনো বিধবা বা বয়োবৃদ্ধাকে?’
হজরত জাবির (রা.) বললেন, ‘একজন বিধবা নারীকে।’
তা শুনে নবীজি (সা.) স্বভাবসুলভ স্নেহে বললেন, ‘তুমি কোনো কুমারী মেয়েকে বিয়ে করলে না কেন? তাহলে তো তুমিও তার সাথে আনন্দ-আমোদ করতে পারতে এবং সেও তোমার সাথে হাসিখুশি সময় কাটাতে পারত!’
তখন জাবির (রা.) অত্যন্ত বিনয়ের সাথে নিজের সিদ্ধান্তের পেছনের মূল কারণটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন—
‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার পিতা শাহাদাত বরণের সময় ছোট ছোট অনেকগুলো মেয়ে রেখে গেছেন। আমি চাইনি তাদের মতো অনভিজ্ঞ কোনো তরুণীকে ঘরে এনে তাদের ওপর বসিয়ে দিতে, যে তাদের ঠিকমতো দেখাশোনা করতে পারবে না। তাই আমি এমন একজন অভিজ্ঞ নারীকে বিয়ে করেছি, যিনি আমার বোনদের যত্ন নিতে পারবেন, তাদের চুল আঁচড়ে দেবেন, তাদের সুন্দর শিষ্টাচার ও আদব-কায়দা শেখাবেন এবং সুন্দরভাবে গড়ে তুলবেন।’ সুবহানাল্লাহ!
তরুণ জাবিরের এমন গভীর দায়িত্ববোধ, বিচক্ষণতা এবং বোনদের প্রতি ভালোবাসা দেখে আল্লাহর রাসুল (সা.) অত্যন্ত আনন্দিত ও আপ্লুত হলেন। তিনি জাবিরের সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করলেন এবং তার জন্য বরকতের দোয়া করে বললেন—
بَارَكَ اللهُ لَكَ
উচ্চারণ: ‘বারাকাল্লাহু লাকা।’
অর্থ: ‘আল্লাহ আপনার/তোমার ওপর বরকত নাজিল করুন।’ (বুখারি ৫৩৬৭, মুসলিম ১৪৬৬)
কুরআন ও হাদিসের চোখে পরিবারের দায়িত্ব ও এতিমের লালন-পালন
ইসলামে পরিবারের দেখভাল করা এবং এতিম বা অসহায় স্বজনদের যত্ন নেওয়ার ফজিলত অত্যন্ত অপরিসীম। হজরত জাবির (রা.)-এর এই কাজ ছিল কুরআন ও হাদিসের নির্দেশের এক জীবন্ত উদাহরণ।
১. বোন ও স্বজনদের দেখভালের সওয়াব
পিতার অনুপস্থিতিতে বোনদের দেখাশোনা করা এবং তাদের সঠিক শিক্ষা দেওয়া জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যম। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ كَانَتْ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ أَوْ ثَلَاثُ أَخَوَاتٍ ... فَصَبَرَ عَلَيْهِنَّ وَأَطْعَمَهُنَّ وَسَقَاهُنَّ وَكَسَاهُنَّ مِنْ جِدَتِهِ كُنَّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
‘যার তিনটি কন্যা বা তিনটি বোন রয়েছে এবং সে তাদের প্রতি ধৈর্য ধারণ করে, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পানাহার ও পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করে—কিয়ামতের দিন তারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে ঢাল হয়ে দাঁড়াবে।’ (ইবনে মাজাহ ৩৬৬৯, মুসনাদে আহমাদ ১৬৮২৬)
২. এতিম স্বজনদের প্রতি এহসান বা দয়া
পিতার শাহাদাতের পর হজরত জাবির (রা.)-এর বোনরা ছিল এতিম। কুরআনে মহান আল্লাহ এতিমদের প্রতি সদ্ব্যবহার ও তাদের প্রতি দায়িত্ব পালনের তাগিদ দিয়ে বলেছেন—
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْيَتَامَىٰ ۖ قُلْ إِصْلَاحٌ لَّهُمْ خَيْرٌ
‘আর তারা তোমাকে এতিমদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বলে দাও, তাদের অবস্থার সংশোধন ও কল্যাণ সাধন করা উত্তম।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২২০)
ঘটনাটির মহান শিক্ষা
- দায়িত্ববোধের অনন্য নজির: নিজের ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে পরিবারের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেওয়া একজন আদর্শ ইমানদারের লক্ষণ।
- বিচক্ষণ জীবনসঙ্গী নির্বাচন: বিবাহিত জীবনে কেবল রূপ বা বয়স নয়, বরঞ্চ পরিবারের কল্যাণ, দক্ষতা ও গুণাবলী বিবেচনা করাও এক বিশেষ প্রজ্ঞা।
- রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসাময় সমর্থন: রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের ব্যক্তিগত জীবনের খোঁজ রাখতেন এবং ভালো কাজের জন্য অন্তরের অন্তস্তল থেকে বরকতের দোয়া করতেন।
হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)-এর এই ত্যাগের গল্প আমাদের শেখায় যে, স্বজনদের জন্য করা যেকোনো ছোট-বড় ত্যাগ কখনো বিফলে যায় না। নিজের ব্যক্তিগত চাওয়াকে বিসর্জন দিয়ে যিনি বোনদের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন, প্রতিদানে তিনি পেয়েছিলেন বিশ্বনবী (সা.)-এর বরকতময় দোয়া ও ভালোবাসা। আজকের সমাজে যখন পরিবারগুলো ভাঙনের মুখে পড়ে এবং ছোটখাটো স্বার্থের কারণে সম্পর্কের টানাফোড়েন তৈরি হয়, তখন হজরত জাবির (রা.)-এর এই আদর্শ আমাদের শেখায় কীভাবে ভালোবাসা, ত্যাগ এবং দায়িত্ববোধ দিয়ে একটি পরিবারকে আগলে রাখতে হয়।