পুরান ঢাকার নারিন্দার ব্যস্ত জনপদে দাঁড়িয়ে আছে ঢাকার প্রাচীনতম মসজিদগুলোর অন্যতম বিনত বিবির মসজিদ। প্রায় ছয় শতাব্দীর ইতিহাস, সুলতানি আমলের স্থাপত্য ঐতিহ্য এবং এক নারীর ধর্মীয় অনুরাগের স্মারক এই মসজিদ আজও বহন করছে ঢাকার অতীতের পরিচয়।
পুরান ঢাকার অলিগলি যেন ইতিহাসের একেকটি জীবন্ত অধ্যায়। কোথাও পুরোনো প্রাসাদ, কোথাও প্রাচীন স্থাপনা, আবার কোথাও শতাব্দী পেরিয়ে টিকে থাকা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এসব ঐতিহাসিক নিদর্শনের ভিড়ে নারিন্দা এলাকায় অবস্থিত বিনত বিবির মসজিদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সময়ের পরিবর্তনে চারপাশের জনপদ বদলেছে, বেড়েছে নগরায়ণ, পরিবর্তিত হয়েছে মানুষের জীবনযাত্রা। কিন্তু ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে এই মসজিদ।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্যের ইতিহাসে বিনত বিবির মসজিদের স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ৮৬১ হিজরি বা ১৪৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের শাসনামলে মসজিদটি নির্মিত হয়। এর নির্মাতা ছিলেন মারহামাতের কন্যা মুসাম্মাত বখত বিনত বিবি। তার নাম অনুসারেই মসজিদটি পরিচিতি লাভ করে বিনত বিবির মসজিদ হিসেবে। সে সময় ঢাকা আজকের মতো বিস্তৃত মহানগর ছিল না। বুড়িগঙ্গা ও আশপাশের জনপদকে ঘিরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল বসতি, বাণিজ্য ও ধর্মীয় জীবনের পরিসর। সেই প্রেক্ষাপটে একটি মসজিদ নির্মাণ শুধু ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণের উদ্যোগ ছিল না; বরং তা ছিল জনপদে মুসলিম সমাজের বিকাশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
মসজিদটির বিশেষত্ব হলো, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একজন নারীর নাম। মধ্যযুগীয় সমাজে ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণে নারীর উদ্যোগের ইতিহাস খুব বেশি আলোচিত হয় না। সেই বিবেচনায় বিনত বিবির মসজিদ কেবল একটি প্রাচীন উপাসনালয় নয়, বরং ইতিহাসে নারীর অবদান স্মরণ করারও একটি উপলক্ষ। মুসাম্মাত বখত বিনত বিবির ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সহজলভ্য না হলেও তার উদ্যোগে নির্মিত এই স্থাপনা কয়েক শতাব্দী ধরে তার নামকে ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে।
মসজিদটির স্থাপত্যে সুলতানি আমলের নির্মাণরীতির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদটির সম্প্রসারণ ও সংস্কার হয়েছে। ফলে এর বর্তমান অবয়বে বিভিন্ন সময়ের নির্মাণ ও পরিবর্তনের ছাপ দেখা যায়। প্রাচীন স্থাপনার ক্ষেত্রে এমন পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। তবে ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণœ রেখে সংস্কার করা এবং পরবর্তী সংযোজনের সঙ্গে মূল স্থাপত্যের পার্থক্য নির্ণয় করা ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বিনত বিবির মসজিদের গুরুত্ব শুধু এর বয়সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ঢাকার নগরায়ণ, ধর্মীয় জীবন ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার সাক্ষ্য বহন করে। একটি জনপদ কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিবর্তিত হয়েছে, কীভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে এবং কীভাবে পুরোনো স্থাপনা নতুন সময়েও টিকে রয়েছেÑএই মসজিদ সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
কিন্তু ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শুধু এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন যথাযথ নথিভুক্তি, স্থাপত্য জরিপ, ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। কোনো স্থাপনার মূল বৈশিষ্ট্য নষ্ট করে অপরিকল্পিত সংস্কার করলে তার ঐতিহাসিক মূল্য কমে যেতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, ইতিহাসবিদ, প্রতœতত্ত্ববিদ ও স্থাপত্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মসজিদটির নির্মাণকাল, বিভিন্ন পর্যায়ের সংস্কার এবং স্থাপত্যের বিবর্তন নিয়ে তথ্যভিত্তিক গবেষণা ও প্রকাশনাও জরুরি।
একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে এ ধরনের ঐতিহাসিক স্থাপনার পরিচয় তুলে ধরতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য ঐতিহ্যভিত্তিক ভ্রমণ, তথ্যসমৃদ্ধ ফলক, নির্ভরযোগ্য প্রকাশনা এবং ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা গেলে বিনত বিবির মসজিদ সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ আরও বাড়বে। তবে ঐতিহ্য সংরক্ষণের নামে মসজিদের ধর্মীয় পরিবেশ ও স্থানীয় মুসল্লিদের স্বাভাবিক কার্যক্রম যেন ব্যাহত না হয়, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন।
আজকের ব্যস্ত নগরজীবনে দাঁড়িয়ে বিনত বিবির মসজিদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি শহরের পরিচয় শুধু তার উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তার পরিচয়ের বড় অংশ জুড়ে থাকে অতীতের স্মৃতি, মানুষের বিশ্বাস, স্থাপত্যের বিবর্তন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান ইতিহাস।
প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই মসজিদ ঢাকার ঐতিহ্যের এক মূল্যবান সম্পদ। এর দেয়াল ও স্থাপত্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সময়ের দীর্ঘ পথচলা। তাই বিনত বিবির মসজিদকে শুধু পুরোনো একটি উপাসনালয় হিসেবে দেখলে চলবে না; দেখতে হবে ঢাকার ইতিহাসের জীবন্ত দলিল হিসেবে। যথাযথ সংরক্ষণ, গবেষণা ও জনসচেতনতার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক নিদর্শনকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অক্ষুণœ রাখাই হবে আমাদের দায়িত্ব।
এক নজরে
অবস্থান : পুরান ঢাকার নারিন্দা এলাকায় অবস্থিত বিনত বিবির মসজিদ।
নির্মাণকাল : ৮৬১ হিজরি বা ১৪৫৭ খ্রিষ্টাব্দ।
নির্মাতা : মারহামাতের কন্যা মুসাম্মাত বখত বিনত বিবি।
শাসনামল : সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের শাসনামলে নির্মিত।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব : ঢাকার প্রাচীনতম মসজিদগুলোর অন্যতম।
নামকরণ : নির্মাতা বিনত বিবির নামেই মসজিদটির পরিচিতি।
ঐতিহ্য : সুলতানি আমলের ধর্মীয় স্থাপত্য ও ঢাকার প্রাচীন মুসলিম জনপদের ইতিহাসের স্মারক।
বিশেষত্ব : মধ্যযুগে একজন নারীর উদ্যোগে নির্মিত ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনা।
সংরক্ষণের গুরুত্ব : ঢাকার প্রাচীন স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।