ফেনীতে অগ্নিনির্বাপণে ও দুর্যোগ মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসের জনবল ও প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও ফেনী শহরের বিভিন্ন আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় সরু গলি এবং অপরিকল্পিত বহুতল ভবন নির্মাণ প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে অগ্নিনির্বাপণে জলাশয় ও প্রশস্ত রাস্তার সংকট। এতে ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে ফেনী শহর।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, শহরের বড় বাজার, পৌর হকার্স মার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকার আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে। আগুন লাগলে সরু গলির কারণে সময়মত ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ফেনী শহরের শাহীন একাডেমি সড়ক, পুরাতন পুলিশ কোয়ার্টার, জহুর হোসেন চৌধুরী সড়ক, হাজী কেরামত আলী সড়কসহ শহরের প্রায় সবকয়টি স্থানে অপরিকল্পিত ভবন গড়ে উঠেছে। এসব ভবনে প্রবেশের রাস্তাগুলো সরু হওয়ার কারণে আগুন লাগলে বিপদের মাত্রা বাড়বে।
নিয়মানুযায়ী সাততলা ভবন নির্মাণের জন্য ১০ থেকে ১২ ফুট রাস্তা থাকার নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। একটি ভবন থেকে অপর ভবনের দূরত্ব ৩ ফুট থাকার কথা থাকলেও তাও মানা হচ্ছে না। অগ্নিনির্বাপণের জন্য এসব বহুতল ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে রিজার্ভ পানির ট্যাংকি রাখার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ ভবনে তা নেই। যার কারণে অগ্নিকাণ্ডে পানির অভাবে বেগ পেতে হবে ফায়ার সার্ভিসকে। এদিকে শহরে অধিকাংশ জলাশয়গুলো ভরাট করে ভবন নির্মাণের কারণে পানির উৎস হারিয়ে যাচ্ছে।
ফেনীতে অগ্নি ঝুঁকি প্রসঙ্গে ফেনী ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ হারুন পাশা বলেন, অগ্নিনির্বাপণে বড় চ্যালেঞ্জ আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে পানির উৎস কমে যাওয়া। অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে অগ্নি ঝুঁকির মাত্রা বাড়ছে। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করতে হলে রাস্তা প্রশস্ত থাকতে হবে। কিন্ত ফেনী শহরের বড় বাজারসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকার রাস্তাগুলো এত সরু যে আগুন লাগলে ওই সব স্থানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করতে পারবে না।
তিনি আরও বলেন, ফেনী শহরের অধিকাংশ বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনে নিয়ম অনুযায়ী অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। জলাশয়ের সংকট, সংকীর্ণ সড়ক এবং ভবন নির্মাণে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করায় শহরের আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনগুলো মারাত্মক অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসকে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, শহরের বড় বাজারে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি নিয়ে প্রবেশের কোনো ব্যবস্থা নেই। সেখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে। এ ছাড়া সেখানে কোনো জলাধার বা পানির উৎস নেই। এসব সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
আবদুল্লাহ হারুন পাশা আরও বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে উৎসুক জনতার ভিড়ের কারণে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। তারপরও নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এছাড়া ফায়ার সার্ভিস থেকে প্রশিক্ষণ নিতে হবে।
ফেনী শহরের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র বড় বাজারের দোকানগুলোও রয়েছে অগ্নিঝুঁকিতে। চলতি বছরের জুন মাসে ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে ফেনী বড় বাজারে অগ্নি নিরাপত্তায় ১ লাখ ৩২ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার পানি সংরক্ষণাগার স্থাপন করেছে ফেনী পৌরসভা।
এ প্রসঙ্গে ফেনী শহর ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুশফিকুর রহমান পিপুল বলেন, বড় বাজারে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় সাত থেকে আট হাজার দোকান রয়েছে। এসব দোকানের সবগুলোই অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। অগ্নি নিরাপত্তায় বড় বাজারে পানির রিজার্ভার স্থাপন করা হয়েছে।
ফেনীতে অপরিকল্পিত বহুতল নির্মাণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাকির উদ্দিন বলেন, পূর্বে পৌরসভায় বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদনে কিছু অনিয়ম হয়েছে। জনবল সংকটের কারণে ভবনগুলো তদারকি করা সম্ভব হচ্ছে না। লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে সাত তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন পেতে হলে ১০ থেকে ১২ ফুট রাস্তা ও আন্ডারগ্রাউন্ডে রিজার্ভ পানির ট্যাংক থাকার নিয়ম রয়েছে। নিয়ম অমান্য করলে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হবে না।
ফেনী ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ফেনীর ছয় উপজেলায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ২১৮টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রায় ১ কোটি ৯৪ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ৭ কোটি ৪ লাখ ১০ হাজার মালামাল। অগ্নি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫১ জন ব্যক্তি।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের প্রচেষ্টায় বড় ধরনের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এসব অগ্নিকাণ্ডের বেশিরভাগ ঘটনা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট, অসাবধানতাবশত আগুনের ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে ঘটেছে।তবে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হবে বলছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা বিধি মেনে চলা জরুরি। বৈদ্যুতিক সংযোগ ও সরঞ্জাম নিয়মিত পরীক্ষা এবং আগুন ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
ফেনীতে দুর্যোগ প্রতিরোধে ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা প্রসঙ্গে উপসহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ হারুন পাশা বলেন, দুর্যোগ প্রতিরোধে ফেনী ফায়ার সার্ভিসের পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জাম রয়েছে। বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে ফেনী ফায়ার সার্ভিসে ১১ কোটি টাকা মূল্যের ভিমা গাড়ি রয়েছে, যা ১৪ তলা পর্যন্ত উদ্ধার কার্যক্রমে সক্ষম। তবে ভিমা গাড়ি প্রবেশের জন্য ৩০ ফুট রাস্তা থাকতে হবে। অন্যথায় অগ্নিকাণ্ড ঘটলে এটি কাজে আসবে না।
তিনি আরও বলেন, ফেনীতে স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গেফায়ার সার্ভিসের সমন্বয় রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে দুর্যোগের সময় স্বেচ্ছাসেবকরা সহযোগিতা করে। স্বেচ্ছাসেবকদের জীবনরক্ষাকারী জ্যাকেট প্রদান করা হয়।
