কালবেলা · রাজনীতি
বিএনপিকে বাঁচাতে তৃণমূলের যোগ্য ও ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করুন
১৫/১০/২০২৬

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নাম নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি রাজনৈতিক শক্তি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ, নির্যাতন ও অসংখ্য নেতাকর্মীর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দলটি আজকের অবস্থানে এসেছে।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পর ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলে তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় কমিটি গঠন ও নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছু প্রশ্ন সামনে আসছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কাউন্সিলর নির্বাচন, সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক মনোনয়ন এবং কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন হলো—যারা দুঃসময়ে রাজপথে ছিলেন না, দলের কঠিন সময়ে যাদের ভূমিকা দৃশ্যমান ছিলেন না, তারা কীভাবে রাতারাতি কাউন্সিলর হয়ে যাচ্ছেন? আর যারা বছরের পর বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, মামলা-হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকেই আজ উপেক্ষিত কেন?
একেকটি ওয়ার্ডে বিপুলসংখ্যক কাউন্সিলর অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। কিন্তু এসব কাউন্সিলর নির্বাচনের ভিত্তি কী? তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক ভূমিকা এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণের ইতিহাস কীভাবে যাচাই করা হচ্ছে? কাউন্সিলরদের মাধ্যমে যখন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত বা মনোনীত হচ্ছেন, তখন সেই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা হচ্ছে কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা খুবই জরুরি। কারণ, একটি রাজনৈতিক সংগঠনের শক্তি শুধু কমিটির আকারে নয়; বরং তার কর্মীদের সততা, ত্যাগ, আদর্শ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দুঃসময়ে পাশে থাকার মানসিকতার মধ্যে নিহিত।
২০২৪ সালের আন্দোলনের দিনগুলোর কথা কি আমরা ভুলে গেছি?
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পর রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে অনেক এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজন করাও কঠিন ছিল। এমন পরিস্থিতিতে যেসব নেতাকর্মী সাহস করে মিছিল করেছেন, প্রতিবাদ সংগঠিত করেছেন এবং তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়নের মুখোমুখি হয়েছেন, আজ তাদের সাংগঠনিক অবস্থান কী?
যারা ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন, যারা দলের জন্য নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছিলেন, যারা দেশে থেকে আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—তাদের খোঁজ কে রাখছে? কমিটি গঠনের সময় তাদের অভিজ্ঞতা, ত্যাগ ও অবদান কতটুকু বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে?
বিদেশে অবস্থান করেও আমরা অনেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছি, আন্দোলন-সংগ্রামের খবর রেখেছি এবং দেশের নেতাকর্মীদের ভূমিকা দেখেছি। তাই তৃণমূলের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে দলকে দুর্বল করা নয়; বরং দলকে আরও শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও গণমুখী করার স্বার্থেই এসব প্রশ্ন তোলা।
ত্যাগীদের উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে ক্ষতি হবে বিএনপিরই
একটি রাজনৈতিক দলের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—দুঃসময়ের কর্মীরা রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে থাকবেন, আর সুসময়ের সুবিধাভোগীরা নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে আসবেন। যদি ব্যক্তিগত সম্পর্ক, গোষ্ঠীগত প্রভাব কিংবা অন্য কোনো অনুপযুক্ত বিবেচনা রাজনৈতিক ত্যাগ ও যোগ্যতার ওপরে স্থান পায়, তাহলে তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
আজ যারা ত্যাগী নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে কমিটি গঠনের সুযোগ পাচ্ছেন, তাদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক ভূমিকা ও সাংগঠনিক যোগ্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা উচিত। কাউকে অযথা অভিযুক্ত করা নয়, বরং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করাই হওয়া উচিত দলের নীতি।
কারণ, ভবিষ্যতে আবার কোনো রাজনৈতিক সংকট, প্রতিকূলতা কিংবা আন্দোলনের প্রয়োজন দেখা দিলে দলের পাশে কারা দাঁড়াবেন—সেই বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না। সুসময়ে পদ-পদবি গ্রহণ করা সহজ; কিন্তু দুঃসময়ে দলের জন্য ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা সবার থাকে না।
বিএনপির চেয়ারম্যান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আমাদের বিনীত অনুরোধ—
১. ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক করা হোক।
২. কাউন্সিলর তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক অবদান, আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় নেতাকর্মীদের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা হোক।
৩. যারা দীর্ঘদিন দলের দুঃসময়ে ভূমিকা রেখেছেন, নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এবং ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন করেছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হোক।
৪. কমিটি গঠনে কোনো অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, গোষ্ঠীগত প্রভাব কিংবা ত্যাগীদের বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।
৫. তৃণমূলের প্রকৃত নেতাকর্মীদের মতামত গ্রহণ করে এমন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হোক, যারা ভবিষ্যতে দলের আদর্শ, ঐক্য ও সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখতে সক্ষম হবেন।
আমরা বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি রক্ষা করতে চাই। আমরা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নই; যোগ্য, পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতৃত্বের যথাযথ মূল্যায়ন চাই। আমাদের উদ্দেশ্য কাউকে হেয় করা নয়, বরং দলের ভেতরে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো। মনে রাখতে হবে—তৃণমূল দুর্বল হলে দল দুর্বল হয়, আর ত্যাগীদের উপেক্ষা করলে সংগঠনের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এখনই সময় তৃণমূলের বাস্তবতা যাচাই করার, প্রকৃত ত্যাগীদের পাশে দাঁড়ানোর এবং যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে বিএনপিকে আরও শক্তিশালী করার। দল বাঁচাতে হলে তৃণমূলকে বাঁচাতে হবে। তৃণমূলকে বাঁচাতে হলে ত্যাগীদের মূল্যায়ন করতে হবে। বিএনপি আরও শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও জনসম্পৃক্ত হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: জিয়াউর রহমান স্টাডি সার্কেল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক; সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন কমিটির যুক্তরাষ্ট্রের যুগ্ন সদস্য সচিব ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফোরাম যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সাধারণ সম্পাদক
মূল প্রতিবেদনে যান ↗