আমার শৈশব মানে চারের দশকের শেষ দিক। যখন খুবই ছোট তখনই মায়ের ব্যস্ততা দেখে বুঝে যেতাম পুজোর গন্ধ লেগেছে এই বাড়ির আঙিনায়ও। এখনকার মতো সেই সময় তো আর সাত তাড়াতাড়ি পুজোর প্রস্তুতি নেওয়া হতো না। পাঁচের দশকের গোড়ার কথাই বলছি। কারও বাড়িতে এখনকার মতো টিভি তো দূরের কথা, রেডিয়ো অবধি ছিল না। পুজোর গন্ধ পেয়ে যেতাম বাবা মায়ের প্রস্তুতি দেখে আর পাড়ার মাঠে প্যান্ডেলের জন্য বাঁশ এলে। সেই প্যান্ডেল গড়ে তুলত পাড়ার ছেলেরাই। হাতে হাত লাগিয়ে। আমার বাবা সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিক্যাল অফিসারের চাকরি করতেন। টিনের চালা দেওয়া কোয়ার্টার ছিল। একটু দূরেই থাকতেন বাকি সহকারি স্টাফরা।
তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম। পুজোর ছুটি পড়ত ষষ্ঠী থেকে। তার আগে গ্রামের এখানে ওখানে ঢাকিদের রেওয়াজ চলত। সকাল বিকেল দু’বেলাই। কিন্তু সেই আওয়াজ স্কুলের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছালে কার আর পড়াশোনায় মন বসে? আমার মতো সব শিশুরাই চঞ্চল হয়ে উঠত। খেয়াল রাখতেন স্কুলের মাস্টারমশাই। খুবই বকাবকি করতেন। বলতেন, ‘পুজো আসতে আরও এক সপ্তাহ বাকি। পড়ায় মন দাও।’
তবুও মন কি আর অত সহজে ঠান্ডা হয়? বাবা-মা দু’জনেই ব্যাপারটি বুঝতে পারতেন। তাই পড়াশোনা নিয়ে বাড়িতে আর বকুনি খেতে হতো না। তখন তো আর থিম পুজো ছিল না। একচালার পুজো হতো। তবে অসুরের দিকেই যেন সবার নজর থাকত। সবার এক কথা, দেখেছো ওই দশাশই অসুরের কি হাল দাঁড়িয়েছে?
পুজোয় ঘুরে-ঘুরে ঠাকুর দেখে বেড়াতাম। চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার তো হাঁটতেই হতো। কষ্ট হতো কিন্তু মজাও ছিল। তখন জমিদারি প্রথা সবে লোপ পাচ্ছে। কিছু মানুষের হাতে টাকা পয়সা ছিল যা তাঁরা দুর্গাপুজোয় খরচ করতেন। ফলে পাশাপাশি গ্রামগুলোর মধ্যে পুজো নিয়ে রেষারেষিও ছিল। কম বাজেটের পুজোয় একটি মাত্র ঢাক বাজছে। অন্য গ্রামেই হয়তো একাধিক ঢাক, এমনকী সঙ্গে সানাই বাজছে। তখন সব পুজোই চাঁদার উপর নির্ভরশীল ছিল। এখনকার মতো স্পনসরশিপের কোনও প্রচলন ছিল না।
তখন গ্রামের পুজোগুলোয় যত ফুল লাগত তার সবটাই এর-ওর বাড়ির ফুল দিয়েই হয়ে যেত। খুব প্রয়োজন হলে শহর থেকে কিনে আনতে হতো। যদিও তার প্রয়োজন পড়ত না বললেই চলে। অষ্টমীতে ফুল একটু বেশি লাগত কারণ এলাকার সবাই অঞ্জলি দিতেন সকালবেলায়। একবার গ্রামের লীলাদির সঙ্গে পরামর্শ করে একজনের বাড়িতে ফুলচুরি করতে গিয়েছিলাম। লীলাদি আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। লীলাদিই বলেছিলেন, চল না বাচ্চুদির বাগান থেকে গোপনে ফুল তুলে এনে পুরোহিতকে দিই।
সত্যি কথা বলতে কী, প্রতিবার পুজোর চারদিন কিছুটা হলেও ফুলের আকাল হতো। বিশেষ করে অষ্টমীর সকালে। যথারীতি অপারেশন শেষ। ভোরের আলো ফোটার আগেই সব ফুল ঝোলা ভর্তি করে বেরোতে যাচ্ছি এমন সময় বাচ্চুদির মা চোর-চোর বলে চিৎকার করে উঠলেন। আমি ও লীলাদি তো দৌঁড়াচ্ছি। হঠাৎই দেখি, পথ আগলে দাঁড়িয়ে পড়েছেন বাচ্চুদি। বললেন, আমার মায়ের আচরণের জন্য ক্ষমা চাইতে আমিও ছুটে চলে এলাম। এও বললেন, পুজোর এই রাতে বাবা মারা যাওয়াতে মা পুজোর কোনওদিন রাতে ঘুমোন না। মাথায় একটু সমস্যা হয়েছে। তাঁর মায়ের ধারণা, তিনি ফের ফিরে আসবেন। এই বাগানের ফুল নিয়েই অঞ্জলি দিতে যাবেন প্রতি বছরের মতোই।
না তিনি তো ফেরেননি। ফিরবেনও না। বাচ্চুদির সেই কান্না দেখে আমি ও লীলাদিও কেঁদে ফেললাম। পরে চোখের জলে ভেজা সব ফুল দুর্গার পায়ে রেখে প্রার্থনা করেছিলাম, মা বাচ্চুদির মাকে সুস্থ করে দাও।