ছাত্রীদের নিয়ে এ ভাবেই নিয়মিত ফুটবলের তালিম দিচ্ছেন উজ্জ্বলাEi Samay
Published on
:
2 min read
প্রশান্ত পাল, পুরুলিয়া
বর্ষাস্নাত সবুজ মাঠ। হাওয়ায় দুলছে কাশফুল। বাতাসে পুজোর গন্ধ। এমনই এক পুজোর সময়ে উজ্জ্বলাকে খুঁজে পেয়েছিলেন গাঁয়ের একটি ছেলে। নাম তাঁর অনন্ত মাহাতো। পুরুলিয়া-২ ব্লকের বোঙাবাড়ি গ্রামের অনন্তর চোখে তখন এলাকার ছেলেমেয়েদের মাঠমুখো করার স্বপ্ন খেলে বেড়াচ্ছে।
স্কুলে পড়া একটা ব্যাপার। তাই বলে গ্রামের মেয়ে দূরের মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলবে, তা ভাবাই যায় না! কিন্তু উজ্জ্বলা যে অন্য ধাতুতে গড়া। সমাজ এবং পারিবারিক বাধাকে উপেক্ষা করে অন্য ভুবনের খোঁজে সেই মেয়ে ছুটে বেড়ান এখানে-সেখানে। এমনই আবহে একটি ম্যারাথন প্রতিযোগিতায় উজ্জ্বলাকে আবিষ্কার করেন অনন্ত। অভাবী ঘরের মেয়ে। প্রথম তিন জনের মধ্যে থাকতে পারলে হাতে মিলবে কিছু নগদ টাকা। সেই লক্ষ্য নিয়ে ম্যারাথন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন উজ্জ্বলা। সেই দামাল মেয়েকে দেখেই ভবিষ্যতের ছবি এঁকে ফেলেন অনন্ত।
সেই উজ্জ্বলা আজ শুধু বোঙাবাড়ি নয়, এলাকার মেয়েদের কাছে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। বোঙাবাড়ি গার্লস হাইস্কুলের ছাত্রীদের ফুটবল কোচ। উজ্জ্বলার কোচিংয়ে এ বার এই স্কুলের তিন ছাত্রী ঊষা রাজোয়াড়, পুষ্পলতা মাহাতো ও মন্দিরা কর্মকার অনূর্ধ্ব-১৭আন্তঃজেলা স্কুল ফুটবলে পুরুলিয়া জেলা দলের হয়ে খেলেছে। একই প্রতিযোগিতায় অনূর্ধ্ব-১৪ দলে এই স্কুলের ছাত্রী অনুরাধা মাহাতো, পঞ্চমী রাজোয়াড় ও লক্ষ্মীপ্রিয়া মুদি জায়গা পায় জেলা দলে।
ফুটবলের পাশাপাশি অ্যাথলেটিক্সেও দক্ষ উজ্জ্বলা। ২০২৩ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত কলেজে পড়ার সময়েই উজ্জ্বলা অংশ নিয়েছেন ৪০০ মিটার, ৮০০ মিটার ও ১৫০০ মিটার দৌড়ে। সিধো কানহো বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে আন্তঃকলেজ অ্যাথলেটিক্সে সেরা অ্যাথলিটের সম্মান ছিনিয়ে নেন উজ্জ্বলা। ২০২৪-এ ওডিশার ভুবনেশ্বরে দ্যুতিচাঁদ স্টেডিয়ামে ওপেন ইউনিভার্সিটি ন্যাশনালে উজ্জ্বলা অংশ নেন ১৫০০ মিটার ও পাঁচ কিলোমিটার ম্যারাথনে।
তবে কোচ উজ্জ্বলা যেন আরও বেশি ঝলমলে। চলতি বছরের ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট স্কুল অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে হাই জাম্পে রুকসানা খাতুন, পিউ মাহাতো, প্রতিমা রাজোয়াড় ও সুষমা বাউড়ি পুরুলিয়া জেলা দলের প্রতিনিধিত্ব করেছে। এলাকার মেয়েদের কাছে উজ্জ্বলা এখন সাক্ষাৎ দেবী। তাঁর হাতে স্কুল কর্তৃপক্ষও সঁপে দিয়েছেন আগামী প্রজন্মকে গড়ে তোলার দায়িত্ব।
স্কুলের শারীরশিক্ষার শিক্ষিকা বর্ণালি মুদি বলছেন, 'উজ্জ্বলা দায়িত্ব নেওয়ার পরে আমাদের মেয়েদের সাফল্যের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। ও শুধু মেয়েদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে না, স্বপ্ন দেখাচ্ছে আমাদেরও। ওর হাতে মেয়েদের ফুটবলের দায়িত্ব দিয়েছি। এখন স্কুলের ৮০-৯০ জন মেয়ে নিয়মিত ওর কাছে অনুশীলন করে।'
অসুস্থ বাবা কাজ করতে পারেন না। মা দিনমজুরি করে সংসার চালান। উজ্জ্বলা বলেন, 'আমাদের মতো অভাবী পরিবারের একটা মেয়ের কাছে মাঠে নামাটাই স্বপ্ন। আজ কিছু জুটলে কাল কী খাব, সেই অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটে। তবে স্কুল থেকে অল্প টাকা এখন পাচ্ছি। লড়াই থেকে সরব না। যে দিন প্রথম মাঠে এসেছিলাম, সে দিনও লড়াই ছিল, আজও আছে। মেয়েদের বলি, লড়াকু মানসিকতা ছাড়া যাবে না। তা হলে আর জিততে পারবি না।'