রাজধানী ঢাকা থেকে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে মাদারীপুরের শিবচর ও ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত বিস্তৃত রেললাইন স্থানীয়দের জন্য একটি মৃত্যুফাঁদ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। রেল কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রেললাইনে আড্ডা, কনটেন্ট ক্রিয়েট করা, সেলফি তোলা ও হাঁটাহাঁটি করতে গিয়ে প্রায়শই ঘটছে দুর্ঘটনা। জনসাধারণের দিন কাটছে চরম শঙ্কার মধ্যে দিয়ে।
শিবচর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত শুধু শিবচর অংশেই রেলে কাটা পড়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৩৬ জন ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ছবি তুলতে ও ঘুরতে এসে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৮ জনের। এছাড়া, অন্য ১৮ জনের রেললাইন পারাপারের সময় দুর্ঘটনা ও আত্মহত্যাজনিত কারণে মৃত্যু হয় ।
রেলসূত্রে জানা যায়, পদ্মা সেতুর জাজিরা পয়েন্ট থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রেলপথের দূরত্ব প্রায় ৩১ কিলোমিটার। এর মধ্যে মাদারীপুর জেলার শিবচরে পদ্মা ও শিবচর নামে দু’টি স্টেশন রয়েছে। এই রুটে মূলত ঢাকার কমলাপুর থেকে রাজশাহী, খুলনা ও বেনাপোল পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করে। এই এলাকায় নতুন রেললাইন নির্মাণ হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল। প্রতিদিন বিকেল হলেই রেললাইনের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। বিশেষ করে শিবচরের কুতুবপুর, পাঁচ্চর, সূর্যনগর,পুলিয়া ও মালিগ্রাম এলাকায় বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভ্রমণপ্রেমীদের আড্ডা বসে। অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে ঘুরতে আসেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রেললাইনে অরক্ষিত ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতার অভাব এবং দ্রুতগতির ট্রেন চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। স্থানীয়রা দাবি করেছেন, রেললাইনের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে বেড়া দিতে হবে এবং সন্ধ্যার পর টহল আরো জোরদার করতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা দয়াময় মালো বলেন, ‘আমাদের বাড়ির নিকটে রেললাইনটি অবস্থিত। আমি ঢাকায় একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে জব করি। বিভিন্ন ছুটির সময় বাড়ি আসলে তখন পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঘুরতে বের হই। যখন ট্রেন কাছাকাছি আসে তখন আমরা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখি। একটু সচেতন হলে দুর্ঘটনায় এড়িয়ে চলা সম্ভব।’
সরকারি বরহামগঞ্জ কলেজের ছাত্র শিহাব মাহমুদ বলেন, ‘শিবচর রেল স্টেশনটি অত্যন্ত চমৎকার। আসলে এটি একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। আমরা ফ্রেন্ড সার্কেল প্রায় প্রায় এখানে ঘুরতে আসি। ঘুরতে এসে ছবি তুলি এবং বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি করি। যখনই আসি তখনই দেখি দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভীড়। সত্যিই নিজেদের কাছে অসাধারণ উপভোগ্য একটি মুহূর্ত অনুভূত হয়। তবে একটি বিষয় আমাদেরকে খেয়াল রাখতে হবে যখন ট্রেন আসবে তখন আমাদেরকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে হবে তাহলে আমরা ট্রেন দুর্ঘটনার কবল থেকে বাঁচতে পারব।’
শিবচর-ভাঙ্গা রেলওয়ের দায়িত্ব পালনকারী রাজবাড়ী রেলওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক মো: নাসির উদ্দিন বলেন, ‘প্রায়ই দুর্ঘটনায় প্রাণহানির খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাই। মানুষের অসচেতনতার কারণেই এ ধরনের দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। দুর্ঘটনা এড়িয়ে চলতে দর্শনার্থীদেরকে সচেতন হওয়ার জন্য আহ্বান করছি।’
রেললাইনের দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে শিবচর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো: সেলিম হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ঢাকা-বেনাপোলের ট্রেনের রুটটি অত্যন্ত গতিশীল। আমরা বারবার মাইকিং করে এবং সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে এলোমেলোভাবে রেললাইনে বিচরণ করতে নিষেধ করছি। বিশেষ করে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত রেললাইনে হাঁটাহাঁটি বন্ধ করার জন্য বলা হয়েছে। জনসাধারণ সচেতন না হলে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়।’
