বেলা ১১টা। জাতীয় প্রেসক্লাবের হলরুমে তখনো অপেক্ষা করছেন সাংবাদিকেরা। এর মধ্যেই একে একে অনুষ্ঠানস্থলে এলেন গাজীপুরের চারটি সংসদীয় আসন ও সংরক্ষিত নারী আসনের পাঁচজন সংসদ সদস্য। কক্ষে উপস্থিত সাংবাদিকেরা তুলে ধরলেন গাজীপুরের নানা সমস্যার কথা। মনোযোগ দিয়ে সেসব সমস্যা শুনলেন সংসদ সদস্যরা। পরে দিলেন সমস্যা নিরসনের নানা প্রতিশ্রুতি।
ঢাকায় কর্মরত গাজীপুরের সাংবাদিকদের সংগঠন ‘ঢাকাস্থ গাজীপুর সাংবাদিক ফোরাম’-এর আয়োজনে আজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত হয় এই গোলটেবিল বৈঠক।
‘দৃশ্যমান সমস্যা, অবারিত সম্ভাবনার গাজীপুর’ শীর্ষক এ বৈঠকে গাজীপুরের যানজট, পরিবেশদূষণ, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, জলাবদ্ধতা, মাদক, বনভূমি দখলসহ নানা সমস্যা তুলে ধরা হয়। এসব সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথা জানানো হয়। বিশেষ করে বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বচ্ছ মূল্যায়নসহ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেল গাজীপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের দাবি জানানো হয়।
ফোরামের সভাপতি ফয়সাল আলমের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল হকের সঞ্চালনায় বৈঠকে বক্তব্য দেন গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান, গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানা নিশিতা, গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া এবং গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহানসহ অন্যরা।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সাল খান। প্রবন্ধে বলা হয়, শিল্পবর্জ্য ও অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা কলকারখানার কারণে গাজীপুরের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় শিল্পকারখানার কার্যক্রমে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি যানজট, মাদক, কিশোর গ্যাং, সড়কে বর্জ্য ফেলা, ছিনতাই, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, রেলস্টেশনের অকার্যকারিতা, বনভূমি দখল এবং কৃষিজমি ভরাটসহ গাজীপুরের ৫টি সংসদীয় আসনের নির্দিষ্ট সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়।
বিআরটি প্রকল্প নিয়ে স্বচ্ছ মূল্যায়নের দাবি
যানজট নিরসনের উদ্দেশ্যে নেওয়া বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। মূল প্রবন্ধে প্রকল্প বাতিল এবং নির্মিত অবকাঠামো ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে স্বচ্ছ মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
প্রবন্ধে বলা হয়, গাজীপুরবাসীর দীর্ঘ ১৪ বছরের দুর্ভোগ এবং ১৮ জেলার মানুষের যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত, সাশ্রয়ী ও কার্যকর পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ জন্য বিআরটি চালুর সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
যা বললেন বক্তারা
সাংবাদিকদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন বলেন, বাংলাদেশের এমন কোনো অঞ্চল নেই, যেখানকার মানুষ গাজীপুরে বসবাস করেন না। জনবহুল এই জেলার উন্নয়নে জনসংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
বিআরটি প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিআরটি থাকলেও গাজীপুরের মতো জনবহুল এলাকায় প্রকল্প প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। আর মাদকের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশ শুরু থেকেই সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে মাদকের আগ্রাসন কমানো সম্ভব।
গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, গাজীপুরের বর্তমান অবস্থা খুবই বিপন্ন। পরিবেশ রক্ষা করে এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এই জেলায় বসবাস করেন। তাই আগামী ১০০ বছরের কথা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। অন্যথায় একসময় গাজীপুর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে।
এদিকে, গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান বলেন, যানজট নিরসনের জন্য বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান হয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, উত্তরা থেকে একটি ফ্লাইওভারের মাধ্যমে কালীগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও জয়দেবপুরমুখী সংযোগ তৈরি করা হলে যান চলাচলে সুবিধা হতে পারত। সড়কের মাঝখানে একাধিক ডিভাইডার দেওয়ায় যান চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একইভাবে গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী বলেন, বিআরটি প্রকল্পের পরিবর্তে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। গাজীপুরের জয়দেবপুরে একটি পার্ক নির্মাণের প্রস্তাবও দেন তিনি। মাদক নির্মূলে পুলিশের সংস্কার জরুরি উল্লেখ করে তিনি গাজীপুরে বাসভাড়া কমানো এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে গাজীপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের দাবি জানান।
একইভাবে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানা নিশিতা বলেন, প্রত্যেকটা সরকারকেই ভালো কাজ করার জন্য কিছু সময় দিতে হয়। ঠিক একইভাবে আমাদের বিএনপি সরকারকেও সময় দিতে হবে, তাহলেই দেশ ও জাতির উন্নয়ন হবে।
অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্যদের বাইরেও বক্তব্য দেন গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান। তিনি গাজীপুরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ আগের চেয়ে আরও অনেক বেশি তৎপর বলে দাবি করেন।
বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ফোরামের সিনিয়র সহসভাপতি আতাউর রহমান, দপ্তর সম্পাদক এস এম নূর মোহাম্মদ, যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক সাব্বির আহমেদ এবং ফোরামের জ্যেষ্ঠ সদস্যরা।
