টানা তিন ম্যাচ হারের পর কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্স। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হারের পর ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ অব লিজেন্ডসে দলটির সামনে ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জে এবার মিলল স্বস্তির উত্তর।
শারজায় গত রাতে হাইভোল্টেজ লড়াইয়ে ভারত চ্যাম্পিয়ন্সকে ৩ রানে হারিয়ে আসরে প্রথম জয়ের দেখা পেয়েছে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের দল। ছোট পুঁজির ম্যাচে কখনো নিয়ন্ত্রণ, কখনো নাটকীয়তা-সব মিলিয়ে জয়টি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের জন্য আত্মবিশ্বাস ফেরানোর উপলক্ষ!
রোববার রাতে শারজাহ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নামে বাংলাদেশ। শুরুটা ছিল বেশ ঝলমলে। প্রথম দুই ওভারেই স্কোরবোর্ডে জমা হয় ৩০ রান। তবে তৃতীয় ওভারের প্রথম বলেই ইমরুল কায়েসের বিদায়ে ছন্দপতন ঘটে। ৬ বলে ১০ রান করে ফিরতে হয় তাকে। এরপর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে দ্রুতই চাপে পড়ে বাংলাদেশ।
এক প্রান্তে অবশ্য ব্যাট হাতে লড়াই চালিয়ে যান রনি তালুকদার। আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে মাত্র ২৫ বলে ৪০ রান করেন তিনি। চারটি চার ও দুটি ছক্কায় সাজানো তার ইনিংসটি বাংলাদেশকে বড় সংগ্রহের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু রনি ফেরার পর সেই গতি ধরে রাখতে পারেনি দল। ফজলে রাব্বি, জহুরুল ইসলাম ও অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ দ্রুত বিদায় নিলে বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ। মাহমুদউল্লাহর ব্যাট থেকে আসে মাত্র ১ রান।
এমন পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরেন নাসির হোসেন ও আরাফাত সানি। চাপের মুহূর্তে দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে নাসির করেন ২১ বলে ২৪ রান। অন্য প্রান্তে সানি ছিলেন আরও দৃঢ়। ৩৮ বলে ৩৭ রানের ইনিংসে দলের সংগ্রহকে সম্মানজনক জায়গায় নিয়ে যান তিনি। শেষ দিকে আবু জায়েদের ১০ রানের অবদানও কাজে আসে। সব মিলিয়ে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ১৪১ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। ভারতের হয়ে পীযূষ চাওলা নেন তিনটি উইকেট।
১৪২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের বোলারদের সামনে শুরু থেকেই অসহায় দেখায় ভারতকে। পাওয়ারপ্লের মধ্যেই একের পর এক উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যুবরাজ সিংয়ের দল। আম্বাতি রায়ডু, স্টুয়ার্ট বিন্নি ও যুবরাজ সিংয়ের বিদায়ে ভারতের ব্যাটিং অর্ডারে বড় ধাক্কা লাগে। এরপর রবিন উথাপ্পা ও ইউসুফ পাঠানও ফিরে গেলে ৫৫ রানের মধ্যেই পাঁচ উইকেট হারায় দলটি।
ম্যাচ তখন বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে। আর সেই নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেন এনামুল হক জুনিয়র। প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপে নিয়মিত আঘাত হেনে ৩ ওভারে মাত্র ১২ রান দিয়ে তুলে নেন চার উইকেট। তার ঘূর্ণিতে দিশেহারা হয়ে পড়ে ভারতের ব্যাটাররা। শেষ পর্যন্ত ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তার হাতে।
তবে ক্রিকেটের গল্প যে শেষ বলের আগে শেষ হয় না, সেটিই আরেকবার মনে করিয়ে দেয় ভারতের লড়াই। ইরফান পাঠান ৪১ বলে ২৪ রান করে ইনিংস মেরামতের চেষ্টা করলেও রান তোলার গতি বাড়াতে পারেননি। পরে ঋষি ধাওয়ান ও পবন নেগি পাল্টা আক্রমণে ম্যাচে উত্তেজনা ফিরিয়ে আনেন। ঋষি ১৮ বলে ২৪ রান করেন। আর নেগির ব্যাট থেকে আসে মাত্র ১৪ বলে ২৬ রানের ঝোড়ো ইনিংস। পীযূষ চাওলাও ১৮ বলে ২৪ রান করে শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন।
শেষ দুই ওভারে ভারতের সামনে জয়ের সমীকরণ দাঁড়ায় ২৪ রান। বাংলাদেশের জন্য তখনও কাজ শেষ হয়নি। ১৯তম ওভারে কামরুল ইসলাম রাব্বি ১২ রান দিয়ে ফেলায় ম্যাচের উত্তেজনা বেড়ে যায়। শেষ ওভারে ভারতের প্রয়োজন ছিল ১২ রান, হাতে ছিল দুই উইকেট। বল হাতে দায়িত্ব পান আবু জায়েদ রাহি। চাপের মুহূর্তে স্নায়ুর পরীক্ষায় দারুণভাবে উত্তীর্ণ হন তিনি। একটি ওয়াইডসহ পুরো ওভারে দেন মাত্র ৮ রান। কোনো বাউন্ডারি হজম না করে ভারতের জয়ের আশা নিভিয়ে দেন এই পেসার।
নির্ধারিত ২০ ওভার শেষে ৮ উইকেটে ১৩৮ রানে থামে ভারতের ইনিংস। ফলে ৩ রানের নাটকীয় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ। একদিকে এনামুলের চার উইকেট, অন্যদিকে শেষ ওভারে রাহির নিয়ন্ত্রিত বোলিং-বাংলাদেশের জয়ের দুই প্রধান কারিগর হয়ে থাকলেন তারা।
এই জয়ে চার ম্যাচে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ২ পয়েন্টে। তবে জয় পেলেও পয়েন্ট তালিকার তলানি থেকে এখনই বের হতে পারেনি মাহমুদউল্লাহর দল। ছয় দলের প্রতিযোগিতায় ছয় নম্বরে থাকা বাংলাদেশের নেট রানরেট -১.০৫১। সমান ২ পয়েন্ট নিয়ে পঞ্চম স্থানে ভারত, তাদের নেট রানরেট +০.১২৪। অন্যদিকে তিন ম্যাচে তিন জয় নিয়ে ৬ পয়েন্টে শীর্ষে দক্ষিণ আফ্রিকা।
ভারতের বিপক্ষে এই জয় তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু পয়েন্ট পাওয়ার ঘটনা নয়; টানা পরাজয়ের হতাশা কাটিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়ারও সুযোগ। তবে সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা। বুধবার শারজায় দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। প্রথম জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে এবার সেই লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান বদলানোর চ্যালেঞ্জ মাহমুদউল্লাহদের!
