নিজস্ব প্রতিবেদক · ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ৯:৫১ অপরাহ্ন
একটি ঘরের কয়েকটি কক্ষ নিয়ে একটি রিসোর্ট। আবার কোথাও পাহাড়-টিলা কেটে ছোট ছোট ঝোপরি ঘর বানিয়ে নাম দেওয়া হচ্ছে ইকো- রিসোর্ট। কোথাও আবার দালান-কোটা বানিয়েও হচ্ছে রিসোর্ট। পর্যটন জেলা মৌলভীবাজার পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চল এলাকা কেটে নামে বেনামে বেপরোয়া ভাবে ইকো-রিসোর্ট ব্যবসা গড়ে ওঠেছে। গত কয়েক বছরে অন্তত প্রায় দেড়শো রিসোর্ট গড়ে তুলা হয়েছে এ জেলায়।
একই অবস্থা প্রকৃতিকন্যা সিলেটেও। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে এ জেলায় অন্তত সাড়ে পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। তারমেধ্যে হোটেল-মোটেলই বেশি। এসব রিসোর্ট কে বা কারা করছে, এর কোন তালিকা বা বৈধতা আছে কি না তা সুনির্দিষ্টভাবে জানে না সরকারের কোন বিভাগই।
পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, যেসব রিসোর্ট বা হোটেল নির্মাণে ন্যুনতম ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়, সেগুলোর ছাড়পত্র পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে দেওয়া হয়। এর চেয়ে কম বাজেটের কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে দেওয়া হয় না।
অথচ নাম সর্বস্ব রিসোর্টে প্রতিদিনই শত শত পর্যটক যাচ্ছেন। দিনভর সময় কাটানো ছাড়াও রাত্রি যাপন করছেন অনেকে। কিন্তু ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই এসব রিসোর্টে। কোনো কোনো রিসোর্টে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার মতো জরুরি সরঞ্জামাদিও নেই।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৭জনের প্রাণহানির ঘটনায় আলোচনায় আসছে সিলেটের রিসোর্টগুলোর কথাও। সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রিসোর্ট মৌলভীবাজার জেলায়। যার অধিকাংশই শ্রীমঙ্গলে। পাহাড়-টিলা বা বনাঞ্চলের পরিবেশ নষ্ট করে কেন এতো রিসোর্ট করা হচ্ছে, এ নিয়ে পরিবেশবাদীরাও উদ্বেগ জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন জেলা মৌলভীবাজার। এ জেলার সাতটি উপজেলায় কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক ছোট-বড় মিলে প্রায় শতাধিক পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। বাস্তবে সরকারি বা বেসরকারি ভাবে পর্যটন শিল্পের কোন উন্নতি না ঘটলেও পর্যটনের নাম করে রিসোর্ট ব্যবসার ব্যাপক উন্নতি ঘটছে। জেলায় নামে বেনামে অন্তত ২০০ টি রিসোর্ট থাকলেও প্রথম সারির মাত্র ১০ থেকে ১২ টি রিসোর্ট রয়েছে।
২০০৮ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পর্যটন জেলা হিসেবে মৌলভীবাজারকে ঘোষণা করা হয়। এরপর জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ২০১৩ সালে প্রায় ১৩ একর জায়গা জুড়ে প্রথম পাঁচ তারকা মানের গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। এরপর কয়েকবছর পর্যায়ক্রমে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কিছু রিসোর্ট ব্যবসার বিস্তার ঘটতে থাকে। তবে গত ৩ থেকে ৪ বছর ধরে বেপরোয়া ভাবে নামে বেনামে কোন ধরনের আইনের তোয়াক্কা ছাড়াই বাসাবাড়ি, পাহাড়-টিলা কেটে কিছু কক্ষ বানিয়ে রিসোর্ট নাম দেওয়া শুরু হয়। এসব নামে বেনামে রিসোর্টের সরকারিভাবে নেই কোন অনুমোদন।
নাম সর্বস্ব এসব অধিকাংশ রিসোর্টের মালিক মৌলভীবাজারের বাইরের জেলার। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১০৩ টি রিসোর্ট শ্রীমঙ্গল উপজেলায়। এরমধ্যে শুধুমাত্র রাধানগর এলাকায় অন্তত ৪০ থেকে ৪৫টি রিসোর্ট রয়েছে। পর্যটন জেলা ঘোষণার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও যতটুকু পর্যটন সমৃদ্ধ জেলা হওয়ার কথা, বাস্তবে সরকারিভাবে তার তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শুধু মাত্র নামে বেনামে রিসোর্ট ব্যবসাটা চাঙ্গা হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস কে দাশ সুমন বলেন, শ্রীমঙ্গলে প্রায় ১০৩ টি রিসোর্ট আছে। পাহাড়ি এলকা বা কোথাও রিসোর্ট করতে হলো জেলা প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তর, ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি নিতে হয়। প্রকৃত পক্ষে পরিপূর্ণ রিসোর্টের সংখ্যা যদি বলি তাহলে শ্রীমঙ্গলে ১০ থেকে ১২ টি হবে। কেউ যদি ২ শতক জায়গা কিনে কয়েকটি কক্ষ বানায় তাহলে এটাতো রিসোর্টের মধ্যে পরেনা। রিসোর্ট শব্দটাই অনেকেই বুঝেনা।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমদ বলেন, আমাদের জেলায় প্রায় ২০০টি রিসোর্ট রয়েছে। এসব রিসোর্টের মধ্যে শুধু শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ১০০ টির উপর আছে। কিভাবে এতো রিসোর্ট হচ্ছে তা বুঝতে পারছি না। অথচ প্রকৃত অর্থে শ্রীমঙ্গলে মাত্র ১০ থেকে ১২ টা রিসোর্ট আছে। যাদেরকে রিসোর্ট বলা যায়। অনেকেই ৩-৪ টা কক্ষ নিয়ে ভাড়া নিয়ে রিসোর্ট নাম দিয়ে চালিয়ে দিচ্ছেন। এসব রিসোর্ট কারা করছে তা আমাদের জানা নেই।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময় পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চল এলাকা কেটে রিসোর্ট বানানো হচ্ছে। কিভাবে পরিবেশর ক্ষতি করে রিসোর্ট বানানো হয় তা আমরা জানতে চাই। প্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস করে টিলার উপর কেনো রিসোর্ট বানানো হয়। যারা রিসোর্ট বানাচ্ছে তারা বৈধ না অবৈধভাবে তা করছে আজ পর্যন্ত সরকারের কেউ তদারকি করতে দেখিনি।
তিনি বলেন, যত সময় যাচ্ছে বেপরোয়া ভাবে রিসোর্ট বানানোর সংখ্যা বাড়ছে। সরকারের উচিত এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা তৈরি করা। একটা রিসোর্ট তৈরির জন্য সরকারের অনেক গুলো দপ্তর থেকে অনুমতি নেওয়ার কথা থাকলেও কেউ তা পরোয়া করছেন না।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, কে রিসোর্ট করছে কে অনুমতি দিচ্ছে এসব আমার জানা নেই। রিসোর্টের বিষয় নিয়ে আমাদের আরও চিন্তা করা উচিত। আমরা ইতিমধ্যে একটা তালিকা করেছি। রিসোর্ট তৈরির জন্য একটা নীতিমালা করা দরকার। সবকিছু মিলিয়ে একটা প্রজ্ঞাপন করা আমি প্রয়োজন মনো করি।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছ থেকে প্রায় ৬০ টি রিসোর্ট হবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েছে। যেসব রিসোর্ট ২০ কক্ষ বা তার অধিক এসব রিসোর্টের ছাড়পত্র আমরা দেই। বাকি রিসোর্টগুলো কার কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছে এসব আমাদের জানা নেই।
সিলেট হোটেল ও গেস্ট হাউস ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি সুমাত নূরী জুয়েল বলেন, জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে সিলেট জেলায় অন্তত সাড়ে পাঁচতাধিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট আছে। তবে সবগুলোর অনুমোদন আছে কি না, আমাদের জানা নেই। তবে, আমাদের সংগঠনের সদস্য রয়েছেন মাত্র ২২-২৫জন। যাদের প্রত্যেকের লাইসেন্স রয়েছে।
তিনি বলেন, পর্যটন নগরী হিসেবে প্রতিটি রিসোর্ট ও হোটেলে নিরাত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রয়োজনের সবগুলোকে একটা নীতিমালার মাধ্যে আনা প্রয়োজন।
পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, যেসব রিসোর্ট বা হোটেলে ন্যুনতম ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়, সেগুলোর ছাড়পত্র পরিবেশ অধিদপ্তর দিয়ে থাকে। এর চেয়ে কম বাজেটের কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন আমরা দেই না। যেগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয় সেগুলোতে নিয়মিত তদারকি করা হয়।
গুগলে আমাদের খবর পেতে
