আগের সব রেকর্ড ভেঙে বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে চরম মন্দা। এর মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক বাজারে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। আমদানির সামগ্রিক চাহিদা কিছুটা পুনরুদ্ধারের আভাস দিলেও কম মূল্যে পণ্য বিক্রি এবং তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে বড় ধাক্কা খেলেন বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে বাজার কেড়ে নিয়ে আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে গেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী চীন
ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস’ (বিএভি)-এর এক প্রতিবেদনে এ আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১.৬৭ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১১৯৩ কোটি ইউরোতে নেমে এসেছে। অথচ আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ১৩৫০ কোটি ইউরো। অর্থাৎ মাত্র ৮ মাসে দেশের রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ১৫৭ কোটি ইউরো!
একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ২১.৫ শতাংশ থেকে কমে ১৯.৮ শতাংশে ঠেকেছে। রপ্তানির মোট পরিমাণ কিছুটা কমলেও (৪.৫৮ শতাংশ) মূল ধস নেমেছে পণ্যের একক মূল্যে (ইউনিয়ন প্রাইস)। বাংলাদেশে প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ৭.৪৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৩.৭৬ ইউরোতে। ফলে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে মূল রাজস্ব হারিয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ যখন বাজার হারাচ্ছে, তখন কৌশলী পদক্ষেপে অবস্থান পোক্ত করেছে চীন। ইউরোপে প্রধান রপ্তানিকারকদের মধ্যে একমাত্র চীনেরই রপ্তানির পরিমাণ ও মূল্য দুটোই বেড়েছে। চীন তাদের রপ্তানি ২.৩৮ শতাংশ বাড়িয়ে ১৯৭১ কোটি ইউরোতে নিয়ে গেছে। ফলে তাদের বাজার অংশীদারি ৩০.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২.৭ শতাংশে।
অন্যদিকে, ভিয়েতনামের রপ্তানি আয় ৪.৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩০০ কোটি ইউরো পার করেছে, যা উচ্চমূল্যের পণ্যে তাদের সফলতার বার্তা দেয়।
চলতি বছরের শুরুতে ইউরোপে উচ্চ মূল্যস্ফীতি (৩.১%), মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ভোক্তাদের টানা ৪০ মাসের সর্বনিম্ন আস্থা পোশাক কেনাকাটায় বড় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের উদ্বৃত্ত পণ্যের মজুত (স্টক) থাকায় খুচরা বিক্রেতারা বছরের শুরুতে নতুন অর্ডার দেওয়া বন্ধ রাখেন। তবে বছরের মাঝামাঝি (জুন-আগস্ট) এসে শীতকালীন কেনাকাটা ও খুচরা বিক্রি কিছুটা বাড়ায় পোশাক আমদানিতে কিছুটা গতির লক্ষণ দেখা যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের ইউরোপীয় কমিশনের প্রবৃদ্ধি অর্জনের পূর্বাভাস থাকলেও সামনে রয়েছে নানা বড় চ্যালেঞ্জ:
সম্প্রতি ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির কারণে চলা ব্যাপক বিক্ষোভে দেড় হাজারেরও বেশি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা পোশাকের বিক্রি ১৪% পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে। বড়দিনের কেনাকাটা দুর্বল হলে আগামী বছরের শুরুতে তৈরি পোশাকের অর্ডার আরও কমতে পারে।
২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া ভারতের সাথে ইইউ-এর মুক্তবাণিজ্য চুক্তি এবং নতুন জিএসপি নিয়ম নীতি বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল সস্তা পোশাক নির্ভর না হয়ে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক খাতকে অবিলম্বে পণ্যের গুণগত মান, মূল্য সংযোজন এবং বৈচিত্র্যময় সরবরাহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
