সংলাপে জানানো হয়, অর্থনীতিতে জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত নির্ভরতা ও অপরিকল্পিত উৎপাদনপ্রক্রিয়া সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য বড় সংকট তৈরি করছে।
বায়ুদূষণ, অনিরাপদ পানি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও সিসার সংস্পর্শে ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য ও কল্যাণগত ক্ষতির আর্থিক মূল্য ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৭ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। বিশ্বব্যাংকের এ হিসাব পরিবেশদূষণের অর্থনৈতিক প্রভাবের ব্যাপকতা তুলে ধরে। তবে এটি সরাসরি জিডিপি হ্রাসের পরিমাণ নয়; বরং মানুষের স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক কল্যাণের ওপর পরিবেশদূষণের নেতিবাচক প্রভাবের আর্থিক মূল্যায়ন। এমন প্রেক্ষাপটে টেকসই প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিশ্চিতে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরকে অপরিহার্য বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা।
রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে গতকাল সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত ‘ক্যান গ্রিন গ্রোথ ড্রাইভ বাংলাদেশ’স নেক্সট ফেজ অব ডেভেলপমেন্ট?’ শীর্ষক নীতি সংলাপে এ বিষয় উঠে আসে। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন, পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসাইন এবং ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক।
সংলাপে জানানো হয়, অর্থনীতিতে জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত নির্ভরতা ও অপরিকল্পিত উৎপাদনপ্রক্রিয়া সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য বড় সংকট তৈরি করছে। এ ঝুঁকি মোকাবেলা করে উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বজায় রাখতে অর্থনীতিকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পথে পরিচালিত করার বিকল্প নেই।
সংলাপে উপস্থাপিত কম্পিউটেবল জেনারেল ইকুইলিব্রিয়াম (সিজিই) মডেলের সিমুলেশন অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত উচ্চ শক্তি-রূপান্তর প্রবৃদ্ধি (এইচইটি) মডেল অনুসরণ করলে প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর ব্যবস্থা বা বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল (বিএইউ) মডেলের তুলনায় মোট বিনিয়োগ প্রায় ১০৪ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। একই সঙ্গে রফতানি, প্রকৃত মজুরি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে সবুজ রূপান্তরের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি ২০২৩-২০৫০) অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত জলবায়ু সহনশীলতা অর্জনে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এর বড় অংকের অর্থায়ন এখনো অনিশ্চিত। তাই সীমিত সরকারি তহবিল ও আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি বিবেচনায় গ্রিন বন্ড ও কার্বন মার্কেটের মতো বাজারভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন আলোচকরা।
সংলাপে ড. মঞ্জুর হোসাইন বলেন, ‘বাংলাদেশে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে জমির সংকট রয়েছে। এ কারণে নদীর পাড় ও বিশেষত ভবনের ছাদ থেকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তবে ছাদের সৌরবিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করলে গ্রিডের ভারসাম্যহীনতা তৈরির কারিগরি ঝুঁকি রয়েছে। এ জটিলতা এড়াতে ক্ষেত্রবিশেষে বিচ্ছিন্ন গ্রিড বা বিকল্প সংযোগব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নীতিকাঠামো আগে থেকেই রয়েছে। তবে ছাদ ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ কার্যক্রম বাস্তবায়নের অগ্রগতির সঙ্গে নতুন নতুন ব্যবহারিক সমস্যা সামনে আসবে। সেগুলো সমাধানে বিদ্যমান নীতিমালা নিয়মিত পর্যালোচনা ও পরিমার্জন করতে হবে।’ পাশাপাশি এসব কার্যক্রম দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনায় সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও নীতিনির্দেশনা প্রয়োজন বলেও জানান ড. মঞ্জুর হোসাইন।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য সবুজ প্রবৃদ্ধি এখন আর পছন্দের বিষয় নয়; এটি অপরিহার্য বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতীয় নীতি, সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক সহায়তার ভিত্তিতে কীভাবে এ রূপান্তর বাস্তবায়ন করা যায়।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের রাজস্ব ও সরকারি তহবিল সীমিত এবং এসব অর্থের বিপরীতে অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক অগ্রাধিকার রয়েছে। তাই বাজারভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। গ্রিন বন্ড ও কার্বন মার্কেটের মতো সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র বাংলাদেশে এখনো যথেষ্ট অনুসন্ধান করা হয়নি। এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।’
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো বলেন, ‘জ্বালানি সংকট দেখা দিলে উন্নত দেশগুলোও অনেক সময় জলবায়ু প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে কয়লাভিত্তিক জ্বালানির দিকে ফিরে যায়। ফলে বাংলাদেশকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক—উভয় পর্যায়েই লড়াই চালাতে হবে। আমাদের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্যনীতি চাপিয়ে দেয়া হলে কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (কপ) সম্মেলনসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্লাটফর্মে দেশের অধিকার ও দাবির পক্ষে ভূমিকা রাখতে হবে।’
সংলাপে সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় না নিলেও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির টেকসইতার জন্য বড় সংকট তৈরি করছে। এতে ঋণের চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সবুজ প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটা ছাড়া সামনে বিকল্প অত্যন্ত সীমিত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেই এ পথে এগোতে হবে।’
শিল্পনীতি প্রসঙ্গে ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘শিল্পনীতি বলতে শুধু শিল্প মন্ত্রণালয়ের নীতিকে বোঝালে হবে না, বরং পুরো অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও প্রণোদনার পরিবেশ কীভাবে তৈরি হচ্ছে, তা বিবেচনায় নিতে হবে।’
সবুজ রূপান্তরে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অর্থায়নের উৎস ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। অথচ বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর বর্তমান পরিস্থিতির জন্য উন্নত বিশ্বেরও বড় দায় রয়েছে। এ রূপান্তর সফল করতে সরকারি দপ্তরগুলোর পাশাপাশি সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।’ তবে শেষ পর্যন্ত নীতি ও কৌশল বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতা ও শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার জরুরি, যা কার্যকর পদক্ষেপ ও কর্মসূচির মাধ্যমে স্পষ্ট হতে হবে বলেও মত দেন ড. সেলিম রায়হান।
