তবে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এই অভিযোগে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে৷
এদিকে, ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তোজা জানিয়েছেন, অধ্যাপক ইউনূস নিজে এই ঘটনাকে খুব একটা গুরুত্ব বা ধর্তব্যের মধ্যে নিচ্ছেন না৷ তবে তিনি চাইলে দূতাবাস আইনি ব্যবস্থা নেবে৷
যা ঘটেছে
সোমবার ড. ইউনূস নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর থেকে হুইলচেয়ারে বের হওয়ার সময় তাকে হেনস্তা করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে৷ এতে দেখা যায়, অধ্যাপক ইউনূসের দিকে এগিয়ে গিয়ে কয়েকজন লোক উচ্চস্বরে স্লোগান দিচ্ছেন৷ এ সময় তাকে উদ্দেশ্য করে ‘ইউ আর আ টেররিস্ট' এবং ‘হোয়াই ইউ কাম হিয়ার' বলে চিৎকার করতে শোনা যায়৷ বিক্ষোভকারীরা আরও অভিযোগ করেন যে, তিনি দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করেছেন৷
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা যা বললেন
এই ঘটনার পর ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘ড. ইউনূসকে হেনস্তার চেষ্টা আওয়ামী সন্ত্রাস৷ এই বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেবে সরকার৷''
তিনি আরো বলেন, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়, জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তিও এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন৷ এসব ঘটনাকে সরকার আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস হিসেবে দেখছি৷''
‘‘ড. ইউনূস বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন৷ সেখানে বিমানবন্দরে তাকে হেনস্তার চেষ্টা করা হয়েছে৷ শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেয়াটাই হেনস্তা চেষ্টার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে৷ ড. ইউনূসের সরকারের কার্যক্রম নিয়ে যৌক্তিক সমালোচনা থাকতে পারে৷ তিনি নিজেও দেশে বসে সেই সমালোচনা করেছেন৷ কিন্তু এ ধরনের হেনস্তা গ্রহণযোগ্য নয়,'' বলেন ডা. জাহেদ৷
তথ্য উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘‘বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কেউ এ ধরনের কর্মকান্ডের চেষ্টা করলে তা বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেয়া হবে না৷ এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে৷''
এর আগে হেনস্তার শিকার অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে৷ এ ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘সাবেক প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূসের যে ভিভিআইপি মর্যাদা পাওয়ার কথা, তাতে ঘাটতি ছিল কি না, তা সরকার খতিয়ে দেখবে৷''
আওয়ামী লীগের নেতা যা বলছেন
বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক নৌ প্রতিমিন্ত্রী ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী অজ্ঞাত স্থান থেকে টেলিফোনে দাবি করেন, ‘‘ড. ইউনূসকে হেনস্তা করার ঘটনার সঙ্গে আওয়ামী লীগের কেউ জড়িত বলে আমার জানা নেই৷ যারা হেনস্তা করেছেন তাদের ছবি আমি ভিডিওতে যতদূর দেখেছি তাতে কাউকে চিনতে পারিনি৷''
‘‘আমরা কোনো ধরনের সন্ত্রাসী বা মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় এই ধরনের আচরণে বিশ্বাস করি না৷ তবে বাংলাদেশের যারা ক্ষতি করেছে তাদের, পাকিস্তানিদের যেমন বাংলাদেশের মানুষ ঘৃণা করে, তেমনি মব সন্ত্রাস যারা সৃষ্টি করেছে তাদের সমানভাবে ঘৃণা করে৷ এখন এই ঘৃণা কার ওপর কীভাবে বর্ষিত হবে, তার দায় তো আওয়ামী লীগ নেবে না,'' বলেন তিনি৷
এদিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে থাকা লামিয়া মোরশেদের সঙ্গে ডয়চে ভেলের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইউনূস সেন্টারের একজনের ফোন নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করতে বলেন৷ তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘‘এই ঘটনায় ইউনূস সেন্টার কোনো বিবৃতি দিলে তা পাঠানো হবে৷''
দূতাবাস যা বলছে
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তোজা ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমার সঙ্গে প্রফেসর ইউনূসের কথা হয়েছে৷ আমরা ওনার সঙ্গে আরো কথা বলব৷ তিনি যদি মনে করেন জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরের ঘটনায় কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দরকার আছে, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেব৷ তবে তিনি ওই ঘটনাকে ধর্তব্যের মধ্যে নিচ্ছেন না৷''
তিনি বলেন, ‘‘তিনি (ড. ইউনূস) তার রুটিন কাজের অংশ হিসাবে অন্য সময় যেভাবে আসেন সেভাবেই এসেছেন৷ তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে তিনি এয়ারপোর্টের ঘটনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না৷ যারা এই অসম্মানজনক আচরণ করেছে তারা জুলাইয়েও এই একই ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে৷ প্রফেসর ইউনূস ভালো আছেন এবং স্বাভাবিক কাজকর্ম করছেন৷''
এক প্রশ্নের জবাবে গোলাম মোর্তোজা বলেন, ‘‘তিনি যখন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশের প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে যান তা তিনি বাংলাদেশের কনস্যুলেটকে অবহিত করেন না৷ এর কারণ হলো, তিনি জানালে দূতাবাসগুলোর ওপর বাড়তি চাপ পড়ে৷ তিনি এই চাপ দিতে চান না৷ এবারও তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আসার কথা আমাদের অবহিত করেননি৷''
কূটনৈতিক ব্যর্থতার অভিযোগ ও উদ্বেগ
বিদেশে একের পর এক বাংলাদেশি বিশিষ্টজন ও সরকারের প্রতিনিধিদের হেনস্তার ঘটনায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক নেতা ও আইনি বিশেষজ্ঞরা৷
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এই ধরনের ঘটনা আজকে প্রথম ঘটেছে তা নয়৷ এর আগেও আমরা এই ধরনের ঘটনা কয়েকবার দেখেছি৷ এর আগে ইউকেতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা এসসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর ওপর হামলা চেষ্টা করেছে৷ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কয়েকজন উপদেষ্টার ওপর দেশের বাইরে হামলার চেষ্টা হয়েছে৷ গতকাল (সোমবার) অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূসের ওপর হামলার চেষ্টা করা হলো৷ এর আগে আজমেরী হক বাঁধন- ওনাকে ইউরোপের একটি দেশে হেনস্তার চেষ্টা করা হলো৷''
তিনি বলেন, ‘‘আমরা দেখেছি এই ঘটনাগুলোর পর সরকার একটা স্টেটমেন্ট দেয়৷ কিন্তু এটা পরবর্তীতে যাতে না হয়, এটার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া সেটা আমরা সরকারের মধ্য থেকে দেখছি না৷ আমাদের কথা হলো এটা যাতে আর না হয় সেজন্য সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে৷ যেসব দেশে এই ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা আছে, সেই সব দেশের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা৷ আমাদের দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা যাতে সেখানে নিশ্চিত হয় তার ব্যবস্থা করা৷ আর এই ঘটনাগুলো যারা ঘটাচ্ছে তাদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া৷ এই ঘটনাগুলো বারবার ঘটতে দেয়া যায় না৷''
এনসিপির মুখপাত্র মনে করেন, ‘‘এখানে এক ধরনের কূটনৈতিক ব্যর্থতা আছে৷ যার কারণে বারবার ঘটনাগুলো ঘটছে৷''
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর ফারুক বলেন, ‘‘এখন পর্যন্ত দেশের বাইরে এই ধরনের যে কয়টি ঘটনা ঘটেছে সরকার ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা স্পষ্ট নয়৷ তবে দেশে এবং দেশের বাইরে দুই জায়গায়ই ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ আছে৷''
‘‘যেসব দেশে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে সেখানে আমাদের দূতাবাস আছে৷ দূতাবাসগুলো আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারে৷ আর দেশেও ওইসব ঘটনায় মামলা করা যেতে পারে,'' বলেন তিনি৷
ব্যারিস্টার ফারুক বলেন, ‘‘সরকারকে দেশের বাইরে এই ধরনের ঘটনা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে৷ নয়তো দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে৷ আজকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ করলো৷ কালকে হয়তো বিএনপি করবে৷ এটা চলতে দেয়া যায় না৷''
এর আগে গত ৮ সেপ্টেম্বর ইটালিতে অভিনেত্রী আজেমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনা ঘটে৷ তিনি তার ওপর হামলার জন্য তখন ইটালি প্রবাসী আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের দায়ী করেন৷ গত ২৪ জুন যুক্তরাজ্যে এনসিপি নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহকে হেনস্তার চেষ্টা করা হয়৷ তাকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হয়৷
অন্তর্বর্তী সরকারে সময়ও ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে এনসিপি নেতা আখতার হোসেনের ওপর ডিম ছুড়ে মারা হয়৷ ২০২৪ সালের নভেম্বর জেনেভা বিমানবন্দরে অন্তর্বর্তী সরকারের তখনকার উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সঙ্গে অশোভন আচরণ করা হয়৷
