বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় শিল্প, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতাভিত্তিক শিক্ষার প্রসারে স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০১৬ সালে সরকারি অনুমোদন লাভ করে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব রবিন খান। শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণা, প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন আমাদের সময়কে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহিন আলম শাওন
রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে আপনার প্রধান লক্ষ্য কী?
রবিন খান : রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই । এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আমার প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, গবেষণার পরিবেশ সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও পেশাগত দক্ষতা বিকাশের সুযোগ বৃদ্ধি করা। আমরা এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে চাই, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সনদ অর্জন করবেন না; জ্ঞান, মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও বাস্তব কর্মজীবনের উপযোগী দক্ষতাও অর্জন করবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা শিক্ষার মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। আপনাদের শিক্ষকমণ্ডলীর বিশেষত্ব কী?
রবিন খান : যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ তার শিক্ষকরা। শিক্ষকদের একাডেমিক যোগ্যতা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা, গবেষণার অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়বদ্ধতার ওপর শিক্ষার মান অনেকাংশে নির্ভর করে।
এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বাংলাদেশ, ভারত, জাপান, রাশিয়া, চীন, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং তারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে চলেছেন। আমাদের লক্ষ্য অভিজ্ঞ ও যোগ্য শিক্ষকদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী একাডেমিক পরিবেশ গড়ে তোলা।
এছাড়া আমরা প্রতিষ্ঠিত শিল্পী, নাট্যনির্দেশক, সংগীতজ্ঞ কিংবা ফ্যাশন ডিজাইনারের দীর্ঘদিনের পেশাগত অভিজ্ঞতাগুলো শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি তাদের অভিজ্ঞতা অতিথি বক্তব্য, কর্মশালা, বিশেষ প্রশিক্ষণ, মাস্টার ক্লাস ও যৌথ প্রযোজনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে দলা হচ্ছে।
সৃজনশীল বিষয়ে পাঠদানের পাশাপাশি গবেষণাকে কীভাবে এগিয়ে নিতে চান?
রবিন খান : বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক দায়িত্বের একটি হলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টি। গবেষণা ছাড়া উচ্চশিক্ষার পূর্ণতা আসে না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত, নাট্যকলা, নৃত্যকলা, ফ্যাশন ডিজাইন এবং ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে গবেষণার উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা চাই, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা গবেষণায় আরও বেশি সম্পৃক্ত হন। গবেষণার ফল যেন শুধু প্রকাশনায় সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষাদান, সৃজনশীল অনুশীলন এবং সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
এআই এখন সংগীত, অভিনয়, চলচ্চিত্র ও নকশার জগৎকেও বদলে দিচ্ছে। আপনার বিশ্ববিদ্যালয় এ পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে এগোতে পারে?
রবিন খান : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সৃজনশীল শিক্ষার জন্য নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করেছে। নকশা, সম্পাদনা, তথ্য বিশ্লেষণ, অডিওভিজ্যুয়াল প্রযোজনা এবং বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে এর ব্যবহার বাড়ছে।
তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি কখনই মানুষের মৌলিক চিন্তা, শিল্পবোধ ও মানবিক অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ বিকল্প হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি এর নৈতিক ব্যবহার, তথ্য যাচাই এবং মেধাস্বত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। আমরা প্রযুক্তিকে সৃজনশীলতার সহায়ক হিসেবে দেখতে চাই, তার বিকল্প হিসেবে নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডে শিক্ষাবিদ, শিল্পী, স্থপতি, প্রকাশক ও ব্যবসায়িক খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা রয়েছেন। তাদের অভিজ্ঞতা একাডেমিক উন্নয়নে কীভাবে কাজে লাগাতে চান?
রবিন খান : একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতির জন্য বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি, স্থাপত্য, প্রকাশনা, গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্পৃক্ত রয়েছেন।
তাদের অভিজ্ঞতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে সহযোগিতা এবং গবেষণার নতুন সম্ভাবনা চিহ্নিত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে একাডেমিক কার্যক্রমের নিজস্ব স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের সুস্পষ্ট বিভাজন বজায় রাখা অপরিহার্য। ট্রাস্টি বোর্ডের ভূমিকা হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকসই উন্নয়নে নীতিগত সহায়তা দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সম্পদের সংস্থান নিশ্চিত করা।
শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
রবিন খান : বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত করা নয়; তাদের আত্মনির্ভরশীল, উদ্যোগী এবং সমস্যা সমাধানে সক্ষম করে গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সংগীত, নাট্যকলা, ফ্যাশন ডিজাইন ও গণমাধ্যমের মতো ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই সৃজনশীল প্রতিষ্ঠান, প্রযোজনা সংস্থা কিংবা নতুন উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারেন। এ জন্য পাঠ্যক্রমে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগদক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আগামী পাঁচ বছরে রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোন অবস্থানে দেখতে চান?
রবিন খান : আগামী পাঁচ বছরে সৃজনশীল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনন্য উচ্চতায় নিতে চাই। এ লক্ষ্যে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন, গবেষণার পরিবেশ সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও পেশাগত দক্ষতা বিকাশকে অগ্রাধিকার দিতে চাই। আমরা রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শনকে সমকালীন জ্ঞান, প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার সঙ্গে সমন্বয় করে এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে চাই, যেখানে শিক্ষার্থীরা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জন করবেন না; বরং মৌলিক চিন্তা, উদ্ভাবনী সক্ষমতা, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে বিকশিত হবেন।
