অনলাইন ডেস্ক, চট্টগ্রাম নিউজ
একজন আলোকচিত্রী যখন অন্যের যুদ্ধ, ডিসপ্লেসমেন্ট ও দুর্ভোগের সাক্ষী হন, তখন সেই অভিজ্ঞতা কি কেবল তাঁর আলোকচিত্রের বিষয়বস্তুকে পরিবর্তিত করে, নাকি তাঁর নিজের অবস্থান ও জীবনবোধকেও নতুনভাবে পর্যালোচনা করতে বাধ্য করে? মেরিলিন সিলভারস্টোন (Marilyn Silverstone)-এর জীবন ও কর্মের দিকে তাকালে প্রশ্নটি বিশেষ তাৎপর্য অর্জন করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের বিভিন্ন শরণার্থীশিবির ও অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে তাঁর ধারণ করা আলোকচিত্রে যুদ্ধের রাজনৈতিক বাস্তবতা মানুষের শরীর, অসুস্থতা, ক্ষুধা ও অনিশ্চিত অস্তিত্বের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে তাঁর মোনাস্টিক লাইফ গ্রহণের ঘটনা এই আলোকচিত্রগুলোর দিকে ফিরে তাকানোর একটি বিশেষ অবকাশ তৈরি করে। তবে ১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতাকে তাঁর মোনাস্টিক লাইফ গ্রহণের একমাত্র কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করার যথেষ্ট ভিত্তি নেই। তিব্বতি সংস্কৃতি, বৌদ্ধধর্ম এবং হিমালয় অঞ্চলের জীবনযাত্রা সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ আরও আগে থেকেই গড়ে উঠছিল। একইভাবে, মোনাস্টিক লাইফ গ্রহণের পরও তাঁর আলোকচিত্রচর্চা ও সাংস্কৃতিক অনুসন্ধান অব্যাহত ছিল।
ফলে, এখানে মূল অনুসন্ধান কোনো সরল কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা নয়। বরং যুদ্ধ ও ডিসপ্লেসমেন্টের সাক্ষ্য ধারণের অভিজ্ঞতা তাঁর পূর্ববর্তী সাংস্কৃতিক অনুসন্ধানের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত হয়েছিল এবং পরবর্তী জীবনপথের আলোকে সেই অভিজ্ঞতাকে কীভাবে পুনর্বিবেচনা করা যায়, তা অনুধাবন করা। এ ক্ষেত্রে আলোকচিত্রকে একই সঙ্গে ঐতিহাসিক সাক্ষ্য, দৃশ্যগত উপস্থাপনা এবং নৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ অন্যের দুর্ভোগকে দৃশ্যমান করে তোলা এবং সেই দুর্ভোগের অভিজ্ঞতার অংশীদার হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়। এই দুইয়ের মধ্যবর্তী দূরত্বই সিলভারস্টোনের ১৯৭১ সালের আলোকচিত্র ও পরবর্তী জীবনপথের পারস্পরিক সম্পর্ক অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।
১৯২৯ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন মেরিলিন সিলভারস্টোন। তাঁর জন্মের বছরেই গ্রেট ডিপ্রেশন (Great Depression) বা মহামন্দার সূচনা ঘটে, যার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত ১৯৩০-এর দশকজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুভূত হয়। শৈশবের এক পর্যায়ে তাঁর পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যায় এবং পরবর্তী সময়ে নিউইয়র্কের স্কার্সডেলে (Scarsdale) তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর শৈশব ও কৈশোরের সময়কাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯–১৯৪৫) সঙ্গেও সমকালীন ছিল। এভাবে মহামন্দা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তাঁর বেড়ে ওঠার সময়কার বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের অংশ হয়ে ওঠে। তবে এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনবোধ কিংবা পরবর্তী আলোকচিত্রচর্চার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার মতো নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে, এসব ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা তাঁর সংবেদনশীল মনোজগতে কোনো পরোক্ষ অনুরণন সৃষ্টি করেছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করা যায় না।
পরবর্তী সময়ে তিনি ওয়েলেসলি কলেজে (Wellesley College) অধ্যয়ন করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পর Art News, Industrial Design ও Interiors-এর মতো সাময়িকীর সঙ্গে সম্পাদকীয় কাজে যুক্ত হন। পরবর্তীকালে ইতালিতে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দৃশ্য ও বাস্তবতার সম্পর্ক এবং দৃশ্য নির্মাণের প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর আগ্রহ আরও বিস্তৃত হয়। ১৯৫৫ সাল থেকে তিনি পেশাগতভাবে আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন।
তাঁর কৈশোরের একটি ঘটনাও পরবর্তী সাংস্কৃতিক আগ্রহের আলোচনায় তাৎপর্যপূর্ণ। অসুস্থতার কারণে ঘরে অবস্থানকালে তিনি ফসকো মারাইনি (Fosco Maraini)-এর Secret Tibet বইটি পড়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে বইটিকে নিজের জীবনে এক ধরনের ‘key’ হিসেবে স্মরণ করার বিষয়টি তিব্বতি সংস্কৃতির প্রতি তাঁর দীর্ঘস্থায়ী আগ্রহের একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবে এই পাঠ-অভিজ্ঞতাকে তাঁর পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলোর প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যুক্তিসংগত নয়। বরং এটি পরিচিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরের বাইরে অন্য জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে জানার আকাঙ্ক্ষার একটি প্রাথমিক প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সম্পাদকীয় কাজ, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ ও আলোকচিত্রের মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাগত বিকাশকে কেবল একটি মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে উত্তরণের ইতিহাস হিসেবে দেখা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বিভিন্ন সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখার আগ্রহ। পরবর্তী সময়ে ভারত, তিব্বত ও হিমালয় অঞ্চলের প্রতি তাঁর মনোযোগ এই দীর্ঘ অনুসন্ধানেরই বিস্তৃত রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
১৯৫৬ সালে রবি শঙ্কর (Ravi Shankar)-কে কেন্দ্র করে একটি অ্যাসাইনমেন্টের সূত্রে তাঁর ভারত-পরিচয়ের সূচনা ঘটে। ১৯৫৯ সালে তিনি আবার ভারতে ফিরে আসেন এবং ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত নয়াদিল্লিকে কেন্দ্র করে অবস্থান করেন। এ সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন সাময়িকীর জন্য কাজ করতে গিয়ে যুদ্ধ, দারিদ্র্য, সামাজিক জীবন, ধর্মীয় আচার এবং দৈনন্দিন অস্তিত্ব তাঁর আলোকচিত্রের বিষয় হয়ে ওঠে। ভারত তাঁর কাছে কেবল পেশাগত কাজের ক্ষেত্র ছিল না; দীর্ঘ অবস্থান ও সাংস্কৃতিক সংযোগের মধ্য দিয়ে দেশটির বহুমাত্রিক জীবন সম্পর্কে অনুসন্ধানের পরিসর হিসেবেও তাৎপর্য অর্জন করেছিল।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত একজন আলোকচিত্রী হিসেবে তিনি বিভিন্ন সামাজিক বাস্তবতার প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘকাল কোনো দেশে অবস্থান করা এবং সেই সমাজের মানুষের অভিজ্ঞতার পূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠা অভিন্ন বিষয় নয়। তাঁর পেশাগত অবস্থান এমন এক পরিসর তৈরি করেছিল, যেখানে মানুষের জীবনকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হলেও সেই জীবনের সব অভিজ্ঞতার অংশীদার হয়ে ওঠা সম্ভব ছিল না। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধ ও ডিসপ্লেসমেন্টের আলোকচিত্র বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও এই নৈকট্য ও দূরত্বের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশেষ তাৎপর্য অর্জন করে।
তিব্বতি ও হিমালয়ান সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ ভারত-পর্বের মধ্যেই আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৫৯ সালে দালাই লামার (Dalai Lama) ভারতে আগমন এবং তিব্বত থেকে তাঁর নির্বাসন তিব্বতি সংস্কৃতি, বুদ্ধিস্ট ফিলসফি ও হিমালয় অঞ্চলের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসে।
তাঁর তিব্বতি সংস্কৃতি ও বুদ্ধিস্ট ফিলসফির প্রতি আগ্রহ ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগেই গড়ে উঠেছিল। ষাটের দশকের শেষভাগে সিকিমে একটি আলোকচিত্র-প্রকল্পের সূত্রে তিব্বতি বুদ্ধিস্ট শিক্ষক খানপো রিনপোছে (Khanpo Rinpoche)-র সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। এই সংযোগ বুদ্ধিস্ট অনুশীলনের প্রতি তাঁর আগ্রহকে আরও গভীর করেছিল। তাঁর পরবর্তী মোনাস্টিক লাইফের তাৎপর্য অনুধাবনের ক্ষেত্রে এই পূর্ববর্তী অনুসন্ধানের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতাকে তাঁর জীবনপরিবর্তনের একমাত্র কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করার সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে।
এই তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে আলোকচিত্রকে কেবল আলোকচিত্রীর দৃষ্টিতে নির্মিত দৃশ্যগত বিবৃতি হিসেবে না দেখে, আলোকচিত্রী, সাবজেক্ট ও স্পেকটেটরের মধ্যকার সম্পর্কের পরিসর হিসেবেও বিবেচনা করা যায়। আলোকচিত্রী অন্যের দুর্ভোগের সাক্ষ্য ধারণ করে তা ঘটনাস্থল থেকে দূরে অবস্থানকারী দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন। তবে এই প্রক্রিয়ায় আলোকচিত্রীর নির্বাচন ও উপস্থাপনার পাশাপাশি ছবিতে উপস্থিত ব্যক্তির অবস্থান এবং দর্শকের সঙ্গে ছবিটির সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কার অভিজ্ঞতা দৃশ্যমান হচ্ছে, কীভাবে তা উপস্থাপিত হচ্ছে এবং দর্শক সেই উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে অন্যের দুর্ভোগের মুখোমুখি হচ্ছেন কীভাবে! এসব প্রশ্ন আলোকচিত্রের নন্দনতাত্ত্বিক বিবেচনার পাশাপাশি এর রাজনৈতিক ও নৈতিক মাত্রাকেও সামনে নিয়ে আসে।
এই প্রসঙ্গে অরিয়েলা অজোলে (Ariella Azoulay) লেখেন, “Photographs do not speak for themselves. Alone, they do not decipher a thing.” অর্থাৎ, আলোকচিত্র নিজে থেকেই তার অর্থ উন্মোচন করে না; এর তাৎপর্য অনুধাবনের জন্য ছবির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট মানুষদের মধ্যকার সম্পর্ক বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে, উইটনেস ও আলোকচিত্রের সাবজেক্টের সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে অন্যের অভিজ্ঞতাকে ধারণ করার সম্ভাবনা এবং সেই অভিজ্ঞতা উপস্থাপনের অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতা। সিলভারস্টোনের ১৯৭১ সালের আলোকচিত্রে অপুষ্টিতে আক্রান্ত ও গুলিবিদ্ধ শিশুদের উপস্থিতি এই প্রশ্নকে সুনির্দিষ্টভাবে সামনে আনে: তাঁদের শরীরের ক্ষত ও বিপন্নতা কীভাবে যুদ্ধের মানবিক পরিণতির সাক্ষ্য বহন করে এবং সেই দৃশ্য দর্শকের কাছে কী ধরনের নৈতিক দায় তৈরি করে? আলোকচিত্র কোনো অভিজ্ঞতার সাক্ষ্য বহন করলেও সেই অভিজ্ঞতার পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধি নিশ্চিত করে না। ফলে এর সাক্ষ্যমূল্য ও নৈতিক তাৎপর্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার উপস্থাপনা, তার সীমা এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষমতার সম্পর্ককে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই তাত্ত্বিক ও নৈতিক প্রশ্নগুলোর আলোকে সিলভারস্টোনের ১৯৭১ সালের আলোকচিত্রগুলোর তাৎপর্য বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন, বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা এবং এর ফলে সৃষ্ট ব্যাপক ডিসপ্লেসমেন্টের মানবিক পরিণতির মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। ভারতীয় শরণার্থীশিবিরে তাঁর ধারণ করা আলোকচিত্রে অপুষ্টিতে আক্রান্ত ও গুলিবিদ্ধ শিশুদের উপস্থিতি যুদ্ধের নৃশংসতাকে বিমূর্ত রাজনৈতিক বিবরণের পরিবর্তে মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত শরীর ও বিপন্ন জীবনের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান করে তোলে। এই অভিজ্ঞতা তাঁর ওপর কতটা গভীর প্রভাব ফেলেছিল, সে বিষয়ে সালিল ত্রিপাঠির (Salil Tripathi) পর্যবেক্ষণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
তিনি লেখেন: “Marilyn Silverstone, the great Magnum photographer, took many images of emaciated children with bullet wounds. She was affected so much she gradually turned towards Buddhism and away from photography, moving to Nepal.”
ত্রিপাঠির এই বক্তব্য অনুযায়ী, শরণার্থীশিবিরে অপুষ্টিতে আক্রান্ত ও গুলিবিদ্ধ শিশুদের ছবি ধারণের অভিজ্ঞতা তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তবে এই পর্যবেক্ষণকে তাঁর পরবর্তী জীবনপথের প্রত্যক্ষ ও একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। বুড্ডিস্ট অনুশীলন ও তিব্বতি সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ ১৯৭১ সালের আগেই গড়ে উঠেছিল। তাই যুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে তাঁর পরবর্তী মোনাস্টিক লাইফের একক বা নির্ণায়ক কারণ হিসেবে চিহ্নিত না করে, পূর্ববর্তী আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচনা করাই অধিক যুক্তিসংগত।
এখানে আলোকচিত্রের ঐতিহাসিক সাক্ষ্যমূল্য এবং আলোকচিত্রীর ব্যক্তিগত জীবনে তার সম্ভাব্য প্রভাবকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা জরুরি। ছবিগুলো যুদ্ধের মানবিক পরিণতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য বহন করে; অন্যদিকে, সেই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনবোধে কী ধরনের পরিবর্তন এনেছিল, তা অনুধাবনের জন্য তাঁর পরবর্তী জীবনপথ ও প্রাপ্ত তথ্যের সমন্বিত পাঠ প্রয়োজন।
মেরিলিন সিলভারস্টোনের দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘ অবস্থানকে ১৯৭১ সালের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ১৯৫৯ সালে ভারতে ফিরে আসার পর থেকে ১৯৭৩ সালে দেশটি ছেড়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত প্রায় চৌদ্দ বছর তিনি এই অঞ্চলে অবস্থান করেন। এই সময়ের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে এক গভীর রূপান্তর ঘটে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন, বিপুলসংখ্যক মানুষের ভারতে আশ্রয় গ্রহণ এবং পরিণতিতে যুদ্ধ—এই ঘটনাপ্রবাহ দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রীয় সীমানা, আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নতুনভাবে বিন্যস্ত করে। এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যেই সিলভারস্টোন দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থান করছিলেন। ফলে তাঁকে এই ভূরাজনৈতিক রূপান্তরের একজন সমসাময়িক পর্যবেক্ষক হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
১৯৭১ সালের শরণার্থী সংকট সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ তৎকালীন মানবিক বিপর্যয়ের ব্যাপকতা তুলে ধরে। তাঁর অভিজ্ঞতা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের মানবিক পরিণতি অনুধাবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
১৯৭১ সালের পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবনপথে যে পরিবর্তনগুলো ঘটে, সেগুলোর মধ্যে ১৯৭৩ সালে ভারতত্যাগ, ১৯৭৪ সালে ফ্রাঙ্ক মোরেসের (Frank Moraes) মৃত্যু এবং ১৯৭৭ সালে মোনাস্টিক লাইফ গ্রহণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে এই ঘটনাগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে কালানুক্রমিক ধারাবাহিকতা ও প্রত্যক্ষ কারণ-ফলের সম্পর্কের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
১৯৭৩ সালে তিনি ও মোরেস ভারত ছেড়ে লন্ডনে চলে যান। মোরেস ছিলেন The Indian Express-এর সম্পাদক এবং ভারতের রাজনৈতিক ও সংবাদমাধ্যমের পরিসরে দীর্ঘ কর্মজীবনের অধিকারী। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর (Indira Gandhi) রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে The Indian Express-এ প্রকাশিত তাঁর Myth and Reality কলাম তাঁদের ভারতত্যাগের সময়কার রাজনৈতিক ও সম্পাদকীয় প্রেক্ষাপটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনাযোগ্য। তবে তাঁদের ভারতত্যাগের পেছনে এই রাজনৈতিক বিরোধ কতটা নির্ধারক ছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
১৯৭৪ সালে মোরেসের মৃত্যু সিলভারস্টোনের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। এর পরবর্তী সময়ে তিনি তিব্বতি বুড্ডিস্ট শিক্ষক ও অনুসারীদের মাধ্যমে নেপালের একটি প্রত্যন্ত মঠের পরিবেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন। ১৯৭৭ সালে তিনি বুড্ডিস্ট মোনাস্টিক লাইফ-এর দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং নগাওয়াং ছোড্রন (Ngawang Chödrön) নাম ধারণ করেন।
এই সিদ্ধান্তকে তাঁর পূর্ববর্তী জীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো আকস্মিক রূপান্তর হিসেবে দেখা যায় না। তিব্বতি সংস্কৃতি, বুড্ডিস্ট অনুশীলন এবং হিমালয় অঞ্চলের জীবনযাত্রা সম্পর্কে দীর্ঘদিনের আগ্রহ তাঁর এই নতুন জীবনপর্বের পটভূমি তৈরি করেছিল। তবে পূর্ববর্তী আগ্রহ থাকা মানেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত অনিবার্য ছিল, এমন নয়। বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে এই সিদ্ধান্তকে স্থাপন করা অধিক যুক্তিসংগত।
এই আলোচনায় এথিক্যাল উইথড্রয়াল (ethical withdrawal) ধারণাটি একটি ব্যাখ্যামূলক সম্ভাবনা তৈরি করে। সিলভারস্টোনের মোনাস্টিক লাইফ গ্রহণকে সামাজিক বাস্তবতা থেকে পলায়ন বা মানবিক দায়িত্ব পরিত্যাগ হিসেবে না দেখে, জীবনযাপন, পরিচয় ও অগ্রাধিকারের পুনর্বিন্যাস হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবে ‘নৈতিক প্রত্যাহার’ সিলভারস্টোনের নিজের ঘোষিত অভিপ্রায় নয়; তাঁর জীবনপথের এই পরিবর্তনকে বোঝার জন্য এটি একটি বিশ্লেষণী ধারণা।
মোনাস্টিক লাইফ গ্রহণের পর তাঁর পেশাগত আলোকচিত্র সাংবাদিকতার পরিসর বদলে গেলেও আলোকচিত্রভিত্তিক প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক অনুসন্ধানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অব্যাহত ছিল। নেপালের কাঠমান্ডুতে অবস্থানকালে তিনি ভারতের রাজস্থান এবং হিমালয় অঞ্চলের বিলুপ্তপ্রায় সাংস্কৃতিক রীতিনীতি ও প্রথা নিয়ে গবেষণা করেন।
১৯৮৫ সালে প্রকাশিত Ocean of Life: Visions of India and the Himalayan Kingdoms গ্রন্থে ভারত, সিকিম, ভুটান ও নেপালের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনের নানা দিক স্থান পেয়েছে। পরবর্তী সময়ে The Black Hat Dances (১৯৮৭) তাঁর এই দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক আগ্রহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
তাঁর জীবন ও কর্মের ধারাবাহিকতা থেকে বোঝা যায়, মোনাস্টিক লাইফ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আলোকচিত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবসান ঘটেনি। বরং তাঁর জীবন ও আলোকচিত্র পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত যে, একটিকে অন্যটি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে বিচার করা কঠিন।
তবে এই ধারাবাহিকতা থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও যথাযথ হবে না যে তাঁর ১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে কোনো পরিবর্তন আনেনি। অভিজ্ঞতার প্রভাব সব সময় প্রত্যক্ষভাবে শনাক্তযোগ্য হয় না; তা ব্যক্তির পরবর্তী সিদ্ধান্ত, মনোযোগ ও জীবনবোধের মধ্যে ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হতে পারে।
ভারতে দীর্ঘকাল অবস্থান এবং ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন পরিসরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁর পর্যবেক্ষকের অবস্থানকে ভারতীয় সমাজের অভ্যন্তরীণ অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি অভিন্ন বলে বিবেচনা করা যায় না। একইভাবে, তাঁকে নিছক বহিরাগত পর্যবেক্ষক হিসেবেও চিহ্নিত করা কঠিন। আন্তর্জাতিক আলোকচিত্রী হিসেবে তাঁর পেশাগত পরিচয় ও সাংস্কৃতিক অনুসন্ধান তাঁকে নৈকট্য ও দূরত্বের একটি স্বতন্ত্র অবস্থানে স্থাপন করেছিল। এই অবস্থান বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে জর্জ সিমেলের (Georg Simmel) The Stranger ধারণাটি একটি কার্যকর তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ হতে পারে।
সিমেলের ধারণায়, অপরিচিত ব্যক্তি কোনো সামাজিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তার সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হয়ে ওঠেন না। তাঁর অবস্থানে নৈকট্য ও দূরত্বের সহাবস্থান থাকে। সিলভারস্টোনের জীবন ও আলোকচিত্রচর্চার ক্ষেত্রে এই ধারণাটি প্রাসঙ্গিক। দীর্ঘকালীন অবস্থান ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ তাঁকে ভারতীয় সমাজের নানা বাস্তবতা পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিয়েছিল, কিন্তু সেই সুযোগ সংশ্লিষ্ট মানুষের অভিজ্ঞতার পূর্ণ অংশীদার হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। ফলে তাঁর অবস্থানকে কেবল ইনসাইডার (insider) কিংবা আউটসাইডার (outsider)—এই দুইয়ের কোনো একটির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, সামাজিক সম্পৃক্ততা ও অভিজ্ঞতাগত দূরত্বের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই পার্থক্য আলোকচিত্রের নৈতিক তাৎপর্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। আলোকচিত্র বাস্তবতার একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তকে ধারণ করে, যার সঙ্গে আলোকচিত্রীর নির্বাচন ও দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত থাকে। Seeing is not experiencing; representation is not identification—দেখা মানেই কোনো অভিজ্ঞতার অংশীদার হওয়া নয়, আর ছবিতে সেই অভিজ্ঞতার উপস্থাপনও তার সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন হয়ে ওঠা নয়। সিমেলের The Stranger ধারণার আলোকে সিলভারস্টোনের পেশাগত অবস্থান ও সাংস্কৃতিক অনুসন্ধানকে নতুনভাবে বিবেচনা করা যায়। তবে ১৯৭১ সালের আলোকচিত্র ও পরবর্তী মোনাস্টিক লাইফের মধ্যে প্রত্যক্ষ কার্যকারণ প্রতিষ্ঠা না করে, পর্যবেক্ষকের অবস্থান, অভিজ্ঞতার সীমা এবং নৈতিক দায়ের পারস্পরিক সম্পর্ক অনুসন্ধান করাই অধিক যুক্তিসংগত।
সিলভারস্টোনের জীবনপথের তাৎপর্য তাঁর পেশাগত পরিচয়ের পরিবর্তনে নয়, বরং দেখা, সাক্ষ্য ধারণ ও নিজের অস্তিত্বকে অনুধাবনের মধ্যকার সম্পর্কে নিহিত। ১৯৭১ সালে অন্যের বিপর্যয়ের সাক্ষী হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান—এই দুইয়ের মধ্যে প্রত্যক্ষ কার্যকারণ প্রতিষ্ঠা করা না গেলেও, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক তাঁর জীবনকে নতুনভাবে পাঠ করার অবকাশ তৈরি করে।
তাঁর জীবন ও কাজ একটি মৌলিক প্রশ্ন উন্মুক্ত রাখে: অন্যের ইতিহাস ও দুর্ভোগের সাক্ষী হতে গিয়ে একজন আলোকচিত্রী কি নিজের জীবনকে বোঝার পদ্ধতিও নতুন করে আবিষ্কার করতে পারেন? এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর না মিললেও, সিলভারস্টোনের জীবন সাক্ষ্য, নৈতিক দায় ও ব্যক্তিগত জীবনবোধের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
লেখক : প্রদীপ আইচ।
ছবি : মেরিলিন সিলভারস্টোন।
