বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান, অথচ তার বাংলাদেশ সফরের কোনো পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি নেই! ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ঢাকা আগমন ঘিরে ফুটবল অঙ্গনে তৈরি হয়েছিল কৌতূহল। কোনো আনুষ্ঠানিক সফর নয়, ছিল নিছক যাত্রাবিরতি। মরক্কো থেকে ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে যাওয়ার পথে সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় ঢাকাকে ট্রানজিট হিসেবে বেছে নিতে হয় তাকে। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ ব্যক্তিত্বের এই স্বল্প সময়ের উপস্থিতিকেও কাজে লাগাতে পিছিয়ে থাকেনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)।
আজ রোববার দুপুরে দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন ইনফান্তিনো। বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে অবস্থানকালে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল এবং ফেডারেশনের চার সহসভাপতি। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী আলোচনায় বাংলাদেশের ফুটবলের বর্তমান অবস্থা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং ফিফার সহযোগিতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বাফুফে কর্মকর্তারা।
এই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় কক্সবাজারে ফিফার অর্থায়নে নির্মাণাধীন টেকনিক্যাল সেন্টার। বাফুফের সহসভাপতি ও গভর্নমেন্ট রিলেশনস কমিটির চেয়ারম্যান ওয়াহিদ উদ্দিন চৌধুরি হ্যাপির ভাষ্য, প্রকল্পটির বিষয়ে ইনফান্তিনোকে অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ফিফার আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর বিষয়েও প্রাথমিক আশ্বাস দিয়েছেন ফিফা সভাপতি।
বাফুফের জন্য এই সাক্ষাতের গুরুত্ব অবশ্য শুধু একটি প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের ফুটবলে অবকাঠামো উন্নয়ন, কোচ ও রেফারি তৈরি, বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা এবং নারী ফুটবলের অগ্রযাত্রায় ফিফার সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আনুষ্ঠানিক সফর না হলেও সংস্থাটির প্রধানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগকে কাজে লাগাতে চেয়েছে ফেডারেশন।
এর আগে চলতি মাসের শুরুতে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় ফিফা আসিয়ান কাপ চলাকালে ইনফান্তিনোর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন তাবিথ আউয়াল। সেখানে বাংলাদেশের পুরুষ ও নারী ফুটবল, বয়সভিত্তিক দল এবং উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। ঢাকায় এবারের সাক্ষাৎ সেই যোগাযোগেরই আরেকটি পর্ব।
তবে ইনফান্তিনোর আগমনের পেছনে ছিল পুরোপুরি ভিন্ন একটি ভ্রমণসূচি। মরক্কো থেকে ভুটানে যাওয়ার সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় ঢাকায় বিরতি নিতে হয় তাকে। দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে থিম্পুর উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন তিনি। ভুটানে দুই দিন অবস্থানের কথা রয়েছে তার। ২০ তারিখ ফেরার পথেও বাংলাদেশে যাত্রাবিরতির সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও সে সময় বাফুফের শীর্ষ কর্মকর্তারা জাপানে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) বিশেষ কংগ্রেসে অংশ নিতে থাকবেন।
ইনফান্তিনোর এই আগমন নিয়ে আগ্রহের আরেকটি কারণ রয়েছে। আগামী বছর মার্চে অনুষ্ঠেয় ফিফা সভাপতি নির্বাচনে তৃতীয়বারের মতো প্রার্থী হয়েছেন তিনি। এমন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশের ফুটবল কর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ঢাকায় তার যাত্রাবিরতিকে সরাসরি নির্বাচনী প্রচারণার অংশ বলার মতো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই।
বাংলাদেশের সঙ্গে ফিফা সভাপতিদের যোগাযোগ অবশ্য নতুন নয়। ১৯৮১ সালে ঢাকায় পাইওনিয়ার ফুটবলের উদ্বোধন করেছিলেন সাবেক ফিফা সভাপতি হুয়াও হ্যাভেল্যাঞ্জ। এরপর ২০০৬ সালে এএফসি চ্যালেঞ্জ কাপ উদ্বোধন করতে বাংলাদেশে আসেন সেপ ব্লাটার। ২০১২ সালেও ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। বর্তমান সভাপতি ইনফান্তিনো ২০১৭ সালে এক দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন। দীর্ঘ নয় বছর পর আবারও ঢাকায় এলেন তিনি, যদিও এবার তার সফরের উদ্দেশ্য ছিল না বাংলাদেশের ফুটবল।
এই সফর ঘিরে বাফুফের প্রস্তুতি ও যোগাযোগের ধরন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইনফান্তিনো ঢাকায় অবস্থান করবেন, এমন খবর আগের দিন বিকেল পর্যন্ত নিশ্চিত ছিল না। রাতে বিষয়টি নিশ্চিত হলেও ফেডারেশনের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তিনি ঢাকা ছাড়ার পর ছবি ও ভিডিও সরবরাহ করা হয় সংবাদমাধ্যমকে।
অন্যদিকে জাতীয় দলের সাম্প্রতিক ব্যর্থতা এবং ফুটবলারদের নাইট ক্লাব-সংক্রান্ত বিতর্কের পর জাতীয় দল কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সভার বিষয়েও ফেডারেশনের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ছিল সীমিত। অথচ নারায়ণগঞ্জের একটি একাডেমি পরিদর্শনে সাংবাদিকদের একাধিকবার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ফলে কোন বিষয়ে কতটা স্বচ্ছতা ও গুরুত্ব দিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ইনফান্তিনোর ঢাকা আগমন ছিল কয়েক ঘণ্টার একটি ট্রানজিট বিরতি। বাংলাদেশে তার কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল না, ছিল না পূর্বনির্ধারিত ফুটবল সফরও। কিন্তু সেই বিরতিকেই বাংলাদেশের ফুটবলের প্রয়োজন ও প্রত্যাশা তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে নিয়েছে বাফুফে।
