Ei Samay
Published on
:
3 min read
নতুন জামাকাপড় পড়ে সেজেগুজে পুজোর দিনে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন ওঁরা। মুহূর্তের বিপর্যয়ে সেই আনন্দই যেন এক নিমেষের মধ্যে বদলে গেল দুঃখ-বিরহ আর কান্নার রোলে। সপ্তমীর সন্ধ্যায় বেজে উঠল বিষাদের সুর। শনিবার, প্রথম সপ্তমীর সন্ধ্যায় কলকাতার চোরবাগানের প্যান্ডেলে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। আর সেই ঘটনার পরেই কলকাতা-সহ রাজ্যের অন্যান্য জেলাতেও পুজোর আনন্দ যেন অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছে। চোখে পড়ছে প্রশাসনিক তৎপরতার ছবি। কোথাও আবার মৃতদের জন্য মোমবাতি জ্বালিয়ে শোকজ্ঞাপন করতেও দেখা গিয়েছে।
হবে না সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নিয়মরক্ষার পুজো বীরপুর গ্রামে
পূর্ব বর্ধমানের মাধবডিহির বীরপুর থেকে কলকাতায় ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন সঞ্জয় বেইজ এবং তাঁর পরিবার। তাঁদের আবাস পঞ্চগ্রামে প্রতি বছরই ধুমধাম করে দুর্গাপুজো হয়। সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয় বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও। শনিবার সন্ধ্যায় যখন চোরবাগানের ঘটনায় সঞ্জয়ের স্ত্রী টগর বেইজ এবং ছেলে সন্দীপ বেইজের মৃত্যুর খবরটা এসে পৌঁছল গ্রামে, তখনও অনুষ্ঠানই চলছিল। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দঘন সেই উৎসবের চেহারাটা পাল্টে গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হয় অনুষ্ঠান।
গ্রামের বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, পাঁচটি গ্রামের যৌথ উদ্যোগে প্রতি বছর এই পুজোর আয়োজন করা হয়। প্রতি সন্ধ্যায় বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাও থাকে। কিন্তু, চোরবাগানের ঘটনায় গ্রামের দুই বাসিন্দার মৃত্যুতে এ বছরের সমস্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা। নিয়মরক্ষার জন্য কেবল পুজোটুকুই করবেন তাঁরা।
মণ্ডপের আলো নিভিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে শোকজ্ঞাপন
চোরবাগানের ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যুতে মণ্ডপের সমস্ত আলো নিভিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে মিছিল করে শোকজ্ঞাপন করতে দেখা গেল অনেককেই। রবিবার রাতে চিনার পার্ক অধিবাসীবৃন্দর পুজোয় দেখা গেল এমন ছবি। এ দিন রাত সাড়ে ৮টা থেকে আধঘণ্টা মণ্ডপের সমস্ত আলো নিভিয়ে মোমবাতি এবং প্রদীপ জ্বালিয়ে মৃতদের আত্মার শান্তি কামনা করেন স্থানীয়রা। পুজো উদ্যোক্তাদের তরফে অরবিন্দ কর্মকার জানান, ১৯ জনের মৃত্যুতে ১৯টি প্রদীপ জ্বালানো হয়েছে।
একই ছবি ধরা পড়ল বর্ধমানের ইছলাবাদ ইয়ুথ ক্লাব পুজো কমিটিতেও। রবিবার সন্ধ্যায় মণ্ডপের সব আলো নিভিয়ে দিয়ে, মোমবাতি জ্বালিয়ে শোকজ্ঞাপন করেন পুজো কমিটির সদস্যরা। তাঁরা জানান, চোরবাগান বিপর্যয়ে মৃত ১৯ জনের স্মৃতিতে এই শোকজ্ঞাপন।
কোথাও মণ্ডপে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তা পরিদর্শনে মন্ত্রী
চোরবাগানের ঘটনার পরে পুজো মণ্ডপে নিরাপত্তা নিয়ে কোনও ফাঁক রাখতে চায় না প্রশাসন। পুজোয় যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে রবিবার বিকেলে সিউড়ির বিভিন্ন মণ্ডপে ঘুরলেন রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, জেলাশাসক ধবল জৈন এবং পুলিশ সুপার ভিদিত রাজ ভুন্দেশ। এ দিন তাঁদের পরিদর্শনের তালিকায় ছিল সিউড়ির ইরিগেশন কলোনি, দক্ষিণ তিলপাড়া পুজো কমিটি ও জোনাকি-সহ শহরের বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় মণ্ডপ।
দর্শনার্থীদের অবাধ যাতায়াতের জন্য ঢোকা ও বেরোনোর পথ কতটা প্রশস্ত ও সুরক্ষিত, মণ্ডপের বৈদ্যুতিক তারের বিন্যাস ঠিক আছে কি না এবং পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রয়েছে কি না — মূলত এই বিষয়গুলির উপরেই কড়া নজর দেওয়া হয়।
মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় জানান, শহরের জনবহুল মণ্ডপগুলির সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, পুলিশ সুপার এবং জেলাশাসক স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, প্রবেশ-প্রস্থানের পথ, অগ্নিনির্বাপণ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যাতে বিন্দুমাত্র গাফিলতি না থাকে, তা যাচাই করে নিতেই তাঁদের এই পদক্ষেপ।
বীরভূমের পাশাপাশি, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে রবিবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখেন বারুইপুর পুলিশ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অতীশ বিশ্বাস, এবং বারুইপুর থানার আধিকারিক শান্তনু মিত্র। ফুলতলার দু’টি পুজো মণ্ডপ ও শাসনের পুজো মণ্ডপ পরিদর্শনে যান তাঁরা। ফুলতলায় একটি মণ্ডপের দর্শনার্থীদের বাইরে যাওয়ার পথ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তাঁরা। গেটটি ঠিক করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পূর্ব বর্ধমানেও ধরা পড়ল প্রশাসনিক তৎপরতার ছবি। রবিবার প্রশাসনের তরফে পুজো মণ্ডপ পরিদর্শন করা হয়। কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নেওয়া হয়। এর পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে মালদার ইসলামপুরেও। সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখতে মোতায়েন করা হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। অন্যদিকে, চোরবাগানের ঘটনার পরে শ্রীরামপুরের নেহেরুনগর সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপ এবং মধ্য হওড়ার কদমতলায় সহযাত্রী সর্বজনীনের পুজোর প্যান্ডেলে দর্শনার্থীদের ঢোকা বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ।
