সাম্প্রতিক সময়ে দুই উঠতি বয়সী কিশোর-কিশোরীর অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের সমাজমানসকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে। একজন কিশোর অপ্রতীম এবং অপরজন কিশোরী জান্নাতুল তাজমিন। একদিকে স্বজনহারা পরিবারের আহাজারি, অন্যদিকে দুই ভিকটিমের দৃশ্যত অস্বাভাবিক জীবনযাপন, পরিবারের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব এবং সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র এক চরম বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। দোষারোপের ভিড়ে অপরাধী ও অভিযুক্তদের প্রতি ঘৃণার তীব্রতা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়ে বিচার প্রক্রিয়ায় ধূম্রজাল সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সাথে কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে পরিবার ও সমাজের ভূমিকাকেও।
প্রকৃতপক্ষে, দুই কিশোর-কিশোরীর ভুল নিয়ে আমরা সোচ্চার হলেও এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, তারা কেউই পেশাদার বা দাগী অপরাধী ছিল না। তবে তাদের দুজনেরই যে ভুল ও বিভ্রান্ত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই বাস্তবতা থেকে আমাদের শিশু-কিশোরদের রক্ষা করতে পরিবার ও সমাজের দায়িত্বশীল ভূমিকা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
আমাদের চারপাশে তাকালে দেখা যায়, তথাকথিত উঠতি বয়সে বা টিনএজ সময়ে অনেকেই ভুল সঙ্গ, বিভ্রান্তি ও ভুল পথে চালিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। বয়ঃসন্ধিকাল এমনিতেই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আবেগে তাড়িত এক সময়। এই সময়ে হুট করে আবেগ লাগাম টানতে গেলে প্রায়শই হিতে বিপরীত ঘটে বা বিপর্যয় নেমে আসে। তাই এই বয়সের শিশু-কিশোরদের সতর্কতার সঙ্গে, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এবং ভালো কাজে যুক্ত রেখে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে রাখতে সচেষ্ট হতে হবে।
আজ আমরা চাইলেও অনেক শিশু-কিশোরকে স্মার্টফোন ও ডিজিটাল ডিভাইসের মারাত্মক আসক্তি থেকে মুক্ত রাখতে পারছি না। অনেক মেধাবী ও সৃজনশীল ছেলে-মেয়ে ডিভাইসে আসক্ত হয়ে নিজেদের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। মাত্র ১৫ বছরের অপ্রতীমকে যেভাবে বাইকের নেশা গ্রাস করেছিল—এমন চিত্র আমাদের চারপাশে অহরহ দেখা যাচ্ছে।
এই সংকট নিরসনে উন্নত প্যারেন্টিং বা অভিভাবকত্ব চর্চার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ধনিক বা উচ্চবিত্ত সমাজে প্যারেন্টিং প্রশিক্ষণ হলেও এটি সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। এ ক্ষেত্রে দেশব্যাপী শিক্ষক ও আলেম সমাজ তাঁদের প্রভাবশালী ও সম্মোহনী বক্তব্য দিয়ে শিশু-কিশোরদের সুপথে চালিত করতে এবং ভালো কাজে যুক্ত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
আমরা প্রায়শই সন্তান ও পরিবারের মধ্যকার দূরত্ব এবং কথা না শোনার অভিযোগ শুনতে পাই। অন্যদিকে কিশোর গ্যাংয়ের যে উপদ্রব রাজধানীসহ দেশজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে, তা আমাদের সামাজিক অসহায়ত্বের এক বড় প্রমাণ। কিন্তু এই ভুল শুধরে নেওয়ার সূচনাটা পরিবার থেকেই হতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, তার চালচলন ও পোশাক-আশাকে হঠাৎ কোনো পরিবর্তন আসছে কি না—বাবা-মা ও অভিভাবকদের এসব বিষয়ে সূক্ষ্ম নজর রাখা জরুরি।
তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সংশোধন করতে গিয়ে সন্তানকে উত্তেজিত করে আরও বেশি বেপরোয়া বানিয়ে ফেলা যাবে না। সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানীরা যথার্থই বলেন—‘কারেকশনের আগে কানেকশন রাখা গুরুত্বপূর্ণ’। আপনার সন্তানের সঙ্গে আপনার যোগসূত্র বা বন্ধন কি ঠিক আছে? আপনি কি তার সুবিধা-অসুবিধার খোঁজ নিচ্ছেন, নাকি আপনার অবহেলা ও উদাসীনতায় সে অন্য কোনো ক্ষতিকর সামাজিক পরিমণ্ডলে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে?
ভুল সংস্পর্শে গিয়ে শিশু-কিশোরদের বিভ্রান্ত হওয়া কেবল একটি পরিবারের নয়, বরং গোটা সমাজের জন্য সংকট তৈরি করে। সুতরাং পরিবার ও সমাজকে এক হয়ে যৌথ চক্রে আমাদের শিশু-কিশোরদের সুরক্ষায় যত্নবান হতে হবে। তবেই গড়ে উঠবে এক সুন্দর, সুস্থ ও সুসংগঠিত আগামী প্রজন্ম।
(লেখক: কবি ও কলাম লেখক)
