বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগামী চার বছরের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে নিঃসরণ ১৮ শতাংশ এবং ২০৪৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমানো গেলে প্রাকশিল্প যুগের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপির (ইউনেপ) এক প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ও দেশগুলোর বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে ব্যবধান নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তবে এই সীমা অতিক্রমের মাত্রা ও সময়কাল যথাসম্ভব কমিয়ে আনা এখনো সম্ভব।
ইউনেপের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ আগের বছরের কাছাকাছি ছিল। তবে এটিকে নিঃসরণের সর্বোচ্চ পর্যায় কিংবা স্থিতিশীলতার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করতে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
ইউনেপের নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসন বলেন, ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্য অর্জনে যে বিশাল প্রচেষ্টা প্রয়োজন ছিল, বিশ্ব তা করেনি। দীর্ঘদিন ধরে সময় ফুরিয়ে আসার বিষয়ে সতর্ক করা হলেও দেশগুলো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেরি করেছে। তবে তাঁর মতে, লক্ষ্যটি পুরোপুরি পরিত্যাগ করার সময় এখনো আসেনি। বরং তাপমাত্রা নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেলে সেই পরিস্থিতি যত দ্রুত সম্ভব নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আওতায় দেশগুলোর হালনাগাদ প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলেও বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর বর্তমানে প্রচলিত নীতিগুলো অব্যাহত থাকলে এই বৃদ্ধি ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জীবনযাত্রা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু নীতির ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা। দেশটি চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নিঃসরণকারী। জলবায়ু বিশ্লেষণবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী বিল হেয়ার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মতো বড় জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদক দেশগুলোর রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
পাওয়ার শিফট আফ্রিকার পরিচালক মোহাম্মদ আদো বলেন, সৌর ও বায়ুশক্তির মতো প্রযুক্তি প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত এগোচ্ছে। কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজনীয় গতি দেখাতে পারছে না।
পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের পরিচালক ইয়োহান রকস্ট্রম বলেন, ২০৩৫ সালে বৈশ্বিক নিঃসরণ বছরে প্রায় ৫০ গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য হতে পারে। অথচ তা ৩৫ গিগাটনের নিচে থাকা প্রয়োজন।
দ্রুত উষ্ণতা কমানোর অন্যতম উপায় হিসেবে মিথেন নিঃসরণ হ্রাসের কথা বলেছে ইউনেপ। সংস্থাটির মতে, মিথেন স্বল্পমেয়াদে কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় প্রায় ৮০ গুণ বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। তাই নিঃসরণ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের পাশাপাশি মিথেন নিয়ন্ত্রণেও জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
