একবার হামলার শিকার হয়েছিলেন, এবার আর ফিরলেন না! একটি ফেলে যাওয়া মুঠোফোন নিতে চায়ের দোকানে গিয়েছিলেন ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের ফেসবুক পেইজের প্রতিষ্ঠাতা ও সাংবাদিক লুৎফরুজ্জামান আলিফ ফকির, পরিচিত ছিলেন আলিফ ফকির নামে।
সেখান থেকে ফেরার সময় তাঁর পিছু নেন দুই যুবক। কিছুক্ষণের মধ্যেই শোনা যায় গুলির শব্দ। পরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় তাঁকে। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক জানান, তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে নেত্রকোণার দুর্গাপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের তেলুঞ্জিয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহত আলিফ ফকির বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘রূপসী বাংলা’র নেত্রকোণা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন।
ওই পেজে সীমান্তে চোরাচালান, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধ ও অনিয়ম নিয়ে লেখালেখি করতেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে তাঁর সাংবাদিকতা বা অপরাধবিরোধী লেখালেখির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার আগে তেলুঞ্জিয়া এলাকার চা-দোকানি রবিন রাংসার দোকানে দুই যুবক সিগারেট কিনতে আসেন। তাঁদের বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ বছর। এর আগে ওই দোকানে সিগারেট কিনতে এসে নিজের মুঠোফোন ফেলে গিয়েছিলেন আলিফ ফকির। সেটি নিতে রাত ৮টার দিকে তিনি দোকানে যান। পরে ফোন নিয়ে ফেরার সময় ওই দুই যুবক তাঁর পিছু নেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলির শব্দ শোনা যায়। স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যান।
চা-দোকানি রবিন রাংসা বলেন, ‘ঘটনার আগে দুই ব্যক্তি আমার দোকানে এসে সিগারেট কেনেন। আলিফ ফকির তাঁর ফেলে যাওয়া মুঠোফোন নিতে দোকানে এসেছিলেন। এরপর ওই দুই ব্যক্তি সিগারেট নিয়ে তাঁর পিছু নেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি তিনটি গুলির শব্দ শুনতে পাই। ভয়ে দোকান থেকে বাড়ির ভেতরে চলে যাই।’
প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যে তিনটি গুলির শব্দ শোনা গেলেও পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের শরীরে পাঁচটি গুলির আঘাত রয়েছে। ঘটনাস্থলে গুলির খোসা বা অন্য আলামত উদ্ধার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ খান বলেন, নিহত সাংবাদিকের মাথা, গলা, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি গুলির আঘাত পাওয়া গেছে। ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে।
খবর পেয়ে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের বিশেষ অভিযান চলছে বলে জানা গেছে।
নিহতের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা জানান, ঘটনার সময় তিনি বাড়িতে ছিলেন। স্বামীকে গুলি করে হত্যার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে স্বামীকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
আলিফ ফকির নেত্রকোণার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের শুনুই গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম মহব্বত আলী ফকির। তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে দুর্গাপুর পৌরসভার তেলুঞ্জিয়া এলাকায় বসবাস করতেন।
আগের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, গত বছরের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় আলিফ ফকির দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের হামলায় আহত হয়েছিলেন। ওই ঘটনার সঙ্গে বৃহস্পতিবারের হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো জানা যায়নি। তবে আগের হামলার ঘটনা এবং বর্তমান হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য সংযোগ তদন্ত করে দেখা হলে হত্যার নেপথ্য কারণ উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে।
দুই যুবকের পরিচয়, তাঁদের সঙ্গে আলিফ ফকিরের আগে কোনো বিরোধ ছিল কি না, হামলার পরিকল্পনা কোথায় ও কীভাবে করা হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। হত্যার প্রকৃত কারণ জানতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের আলামত, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ এবং আগের হামলার তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
একজন সাংবাদিককে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় শুধু সরাসরি হামলাকারীদের গ্রেপ্তারই যথেষ্ট নয়; হত্যার পেছনে কোনো পরিকল্পনাকারী বা প্ররোচনাকারী রয়েছে কি না, তাও তদন্তে বেরিয়ে আসা জরুরি।
আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার এই সাংবাদিকের মৃত্যু যেন আরেকটি অমীমাংসিত ঘটনায় পরিণত না হয়—এটাই এখন প্রত্যাশা।
