খুলনা মহানগরী ও জেলায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড, গুলিবর্ষণ ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, খুলনা মহানগরীতে ৩৮টি এবং জেলার ৯টি থানা এলাকায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। সব মিলিয়ে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ৭৩। বিশেষ করে রূপসা, দিঘলিয়া, তেরখাদা ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় অস্ত্রধারীদের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ বাহিনী বিশেষ অভিযান শুরু করেছে।
গত ১৭ অক্টোবর রাতে খুলনা মহানগরীর পশ্চিম টুটপাড়া আমতলা মোড়ে জুম্মান ওরফে জুম্মা নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। রাত আড়াইটার দিকে একটি মোটরসাইকেলে আসা হেলমেট পরা তিন ব্যক্তি তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে তার বাঁ পায়ের ঊরুতে গুলি লাগে। পরে হামলাকারীরা তার মুঠোফোন নিয়ে পালিয়ে যায়। আহত অবস্থায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পুলিশ জানায়, গুলিবিদ্ধ জুম্মান পেশায় একজন মাদক কারবারি। শীর্ষ এক সন্ত্রাসীর হয়ে টুটপাড়া এলাকায় সে মাদক বিক্রি করে আসছিল। প্রতিপক্ষ আরেকটি গ্রুপের সন্ত্রাসীরা মাদককেন্দ্রিক দ্বন্দ্বে তাকে গুলি করেছে।
এর আগে ৪ অক্টোবর দিঘলিয়া এলাকায় নিষিদ্ধ চরমপন্থি সংগঠনের আঞ্চলিক নেতা নাসিমুল করিম নাসিমকে বাড়ির সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। ৫ অক্টোবর রূপসায় বাস শ্রমিক আক্তার ঢালিকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। চলতি বছরের ১৫ আগস্ট আক্তার ঢালীর ছেলে জয় ঢালীকেও কুপিয়ে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
খুলনায় আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি এবং একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ব্যাপক আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। বিগত কয়েক মাসে খুন, ছিনতাই ও সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে পুলিশ সদস্যরাও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। ১০ অক্টোবর ভোররাতে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান থেকে ফেরার পথে মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তরের কাছে জেলা পুলিশের উপপরিদর্শক মো. শাহ আলমকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে ছিনতাইকারীরা। এই ঘটনায় পুলিশের নিরাপত্তাহীনতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। জেলা পুলিশ সদস্যদের রাতে একা চলাচল না করার বিশেষ নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
ধারাবাহিক সন্ত্রাস ও খুনোখুনির নেপথ্য
পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল কারণ মাদক। বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে মাদক বিক্রি নিয়ন্ত্রণ ও টাকার ভাগাভাগি নিয়ে চরম অস্থিরতায় সংঘর্ষ, খুনোখুনির ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া শহর ও শহরতলির এলাকায় আধিপত্য বজায় রাখতে সক্রিয় সন্ত্রাসী গ্রুপ ও কিশোর গ্যাং মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, খুলনা নগরীতে অন্তত ১০টি শীর্ষ অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। কোনো এক গ্রুপের সদস্যের ওপর হামলা হলে পাল্টা হিসেবে খুনোখুনির ঘটনা ঘটে। এদের মধ্যে অনেকে কিলিং মিশনে টাকার বিনিময়ে ভাড়াটে খুনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অপরাধীদের হাতে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। রূপসা, বটিয়াঘাটা ও মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ঘাট ও পরিবহন খাত থেকে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে কিলিং মিশন চালানো হচ্ছে।
আড়ালে থেকে সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনা
পুলিশের দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে সন্ত্রাসী বাহিনী আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। খুলনার অধিকাংশ অপরাধে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ এবং নাসিমুল করিমের নাসিম গ্রুপের নাম ঘুরেফিরে আসছে। এর মধ্যে ৪ অক্টোবর নাসিমুল করিমকে দিঘলিয়ায় বাড়ির সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে অনেকে বিদেশের মাটিতে বা দূর অবস্থানে থেকে খুলনায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে পুলিশ অভিযান চালালেও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না। এ ছাড়া অনেক অপরাধী হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত হয়ে গ্রেপ্তারের পর অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আসছে। কারাগার থেকে বের হয়ে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে শত্রুতা মেটাতে অপরাধে জড়াচ্ছে। ১২ সেপ্টেম্বর দৌলতপুরের ইস্পাহানি জুট প্রেস এলাকায় আব্দুল জলিল মুন্সি হত্যায় জড়িত আসামি ঘটনার কয়েক দিন আগে জামিনে বের হয় বলে দাবি করে পুলিশ।
অপরাধ বিশ্লেষকদের দাবি, গ্রেনেড বাবু ও নূর আজিম গ্রুপের কয়েকজন সদস্যও সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছে। ৬ মে বটিয়াঘাটার চক্রাখালী এলাকায় রিভলবার ও মাদকসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে যৌথ বাহিনী। পরে দুজন কারাগার থেকে মুক্তি পায়। এরপর ৮ মে এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে হত্যার অভিযোগ ওঠে তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
কোটি টাকার মাদক সিন্ডিকেট
খুলনায় কোটি টাকার অবৈধ মাদকের ব্যবসা ও চোরাচালান চলছে। ১৪ অক্টোবর হরিণটানা থানা জিরো পয়েন্ট এলাকায় যৌথ অভিযানে ৩৩ কোটি টাকার মাদক ‘আইস’ জব্দ হয়। সাতক্ষীরা থেকে খুলনাগামী বাস থেকে ৬ কেজি ৫৯৭ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ (আইস) উদ্ধার করা হয়। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, খুলনা ও মোংলা অঞ্চলে বছরে হাজার কোটি টাকার মাদক-বাণিজ্য চলে। ফেনসিডিল, ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রূপসা ঘাট, খালিশপুর, হরিণটানা, সোনাডাঙ্গা, লবণচরা, দৌলতপুরসহ শহরের শতাধিক স্পটে মাদকের কেনাবেচা চলে। পুলিশ প্রশাসনের তালিকায় শহরে ৫৮৪ জন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ ১২৩ জন খালিশপুর এবং ১০২ জন করে হরিণটানা ও সোনাডাঙ্গা থানা এলাকার।
অপরাধ বিশ্লেষক ও পুলিশের বক্তব্য
আইনশৃঙ্খলার এমন অবস্থায় বিশেষ অভিযান শুরু করেছে জেলা পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, ৬ অক্টোবর থেকে জেলা পুলিশের পাশাপাশি মেট্রোপলিটন পুলিশ ও এসআরবি যৌথ স্পেশাল অপারেশন শুরু করেছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে ‘ব্লক রেইড’ দিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ।
তবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সেলিনা আহমেদ বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ পুনর্গঠন জরুরি।
