যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মেহরদাদ আখলাঘি কেতাবচি। সামরিক প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে দীর্ঘ ৪২ বছরের বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই ব্যক্তির ওপর এখন ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণের দায়িত্ব পড়েছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, ৬৮ বছর বয়সী আখলাঘিকে গতকা রোববার (১৮ অক্টোবর) নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে ইরানের পার্লামেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই তার পূর্বসূরি নিহত হওয়ার প্রায় আট মাস পর এ পদে তাকে নিয়োগ দেয়া হলো।
ইরান সরকারের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, মোট ২৭৭টি ভোটের মধ্যে ২৩৭টি ভোট পেয়ে এ পদে নির্বাচিত হয়েছেন আখলাঘি। অন্যদিকে বিপক্ষে ভোট দেন ১৫ জন। পার্লামেন্টের অনুমোদনের পর তিনি তার পূর্বসূরি আজিজ নাসিরজাদেহর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নাসিরজাদেহ নিহত হন। ওই হামলায় দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারাও নিহত হয়েছিলেন। এরপর সাময়িকভাবে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন মাজিদ এবনে রেজা। এখন তিনি আখলাঘির উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
আল জাজিরা বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া ইরানের সামরিক-শিল্প অবকাঠামো পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণের দায়িত্ব পালন করবেন নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। আর আখলাঘির প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা এরই মধ্যে অনুমোদন করেছেন দেশটির জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশন।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কোনো দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন শুরু করবে না। তবে যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় কঠোরভাবে এবং প্রয়োজনে জীবন দিয়ে লড়বে।’
তিনি জানান, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে আখলাঘির ৪২ বছরের বেশি কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, কঠিন জ্বালানিচালিত রকেটের প্রপালশন প্রযুক্তি, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন খাতে আখলাঘির বিশেষ দক্ষতা রয়েছে।
এর আগে তিনি শহিদ বাকেরি ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রুপ, অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশন এবং ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে আখলাঘি এবং এসব প্রতিষ্ঠান। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে তার ওপর।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক দশকে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র এবং সংশ্লিষ্ট অস্ত্র উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আখলাঘি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সেজ্জিল ও জুলফিকার শ্রেণির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্রের উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছেন তিনি। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে আলমাস ক্ষেপণাস্ত্র ও ইয়াসিন গাইডেড বোমা।
মহাকাশে রকেট উৎক্ষেপণব্যবস্থা, গবেষণার কাজে ব্যবহৃত রকেট এবং সেমনানে অবস্থিত ইমাম খোমেনি স্পেস সেন্টার-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সম্পর্কেও তার বিশেষজ্ঞ জ্ঞান রয়েছে বলে জানা গেছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের যুদ্ধে এসব সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
চলতি মাসে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালায়ি-নিক সাংবাদিকদের বলেন, কৌশলগত অস্ত্রের পরিমাণ ও গুণগত মান বাড়ানোর প্রয়োজন থেকেই আখলাঘিকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ইরান।
তিনি বলেন, ‘আক্রমণাত্মক অস্ত্রের সক্ষমতা সক্রিয়ভাবে উন্নত করা হচ্ছে।’
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র বারবার দাবি করেছে, তারা ইরানের সামরিক-শিল্প সক্ষমতার বেশির ভাগই ধ্বংস করে দিয়েছে। তবে তেহরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলার নাগালের বাইরে এখনো তাদের উল্লেখযোগ্য আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা রয়েছে। ইরান আরও দাবি করেছে, যুদ্ধের নতুন অভিজ্ঞতার আলোকে এসব অস্ত্রের উন্নয়ন করা হয়েছে।
চলতি মাসে পার্লামেন্ট সদস্যদের আখলাঘি জানান, যুদ্ধ চলাকালে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনগুলো ভালোভাবে বুঝতে তিনি জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আইআরজিসির সর্বাধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ওয়াহিদিও।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে আখলাঘির অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে সামরিক-শিল্প খাতের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণ উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা।
এদিকে রোববার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে প্রথম বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে কটাক্ষ করেন আখলাঘি। চলতি মাসে ইরানের পারমাণবিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় ‘সবচেয়ে শক্তিশালী বোমা’ ব্যবহারের হুমকি দিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন।
জবাবে সাংবাদিকদের আখলাঘি বলেন, ‘আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি এবং নিশ্চিন্তে আমাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের উচিত তার সেনাদের নিরাপদে আমাদের অঞ্চল থেকে সরিয়ে নেয়ার কথা ভাবা। তিনি যদি একটি বোমাও নিক্ষেপ করেন, তাহলে কতজন সেনাকে তাকে শায়িত অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে, সেটাও তাকে (ট্রাম্প) দেখতে হবে।’
