সেঞ্চুরির জন্য নয়, ক্রিজে টিকে থাকার জন্যই ব্যাট হাতে নেমেছিলেন সাব্বির রহমান। লক্ষ্য ছিল ৩০০-৪০০ বল খেলা, প্রতিপক্ষের বোলারদের ক্লান্ত করা এবং দলকে পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচানো। সেই পরিকল্পনায় সফল হওয়ার পাশাপাশি আট বছরের অপেক্ষারও অবসান ঘটালেন জাতীয় দলের বাইরে থাকা এই ব্যাটার। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দীর্ঘ বিরতি ভেঙে তুলে নিলেন সেঞ্চুরি।
আজ সাব্বিরের ১১৩ রানের ইনিংসে ভর করে খুলনা বিভাগের বিপক্ষে হার এড়িয়েছে রাজশাহী বিভাগ। জাতীয় ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) দ্বিতীয় রাউন্ডে তাই সবচেয়ে আলোচিত নাম সাব্বির রহমান।
২০১৮ সালের ২৮ জুনের পর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আর তিন অঙ্ক ছোঁয়া হয়নি সাব্বিরের। সেদিন চট্টগ্রামে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে শ্রীলঙ্কা ‘এ’ দলের বিপক্ষে বেসরকারি টেস্টে ১৬৫ রানের ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ আট বছর। অবশেষে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে খুলনার বিপক্ষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল। ২২১ বলের ইনিংসে আটটি চার ও একটি ছক্কায় ১১৩ রান করেন সাব্বির। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৮৪ ম্যাচে এটি তার পঞ্চম সেঞ্চুরি।
সাব্বিরের এই ইনিংসের মাহাত্ম্য শুধু ব্যক্তিগত মাইলফলকে নয়, দলের প্রয়োজনেও। ম্যাচের প্রথম ইনিংসে মাত্র ১১৯ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল রাজশাহী। ফলে পরাজয়ের শঙ্কা নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নামতে হয়েছিল তাদের। তৃতীয় দিন শেষে ৩ উইকেটে ৩০০ রান নিয়ে মাঠ ছাড়ে রাজশাহী। শেষ দিনে সাব্বিরের সংগ্রহ ছিল ২১, অধিনায়ক প্রিতম কুমারের ২৭। সেখান থেকে দুজনের সামনে ছিল বড় দায়িত্ব-পরাজয় এড়িয়ে ম্যাচ বাঁচানো!
প্রিতম ৪৪ রান করে ফিরে গেলেও এক প্রান্ত আগলে রাখেন সাব্বির। উইকেটে সময় কাটানোই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। শেষ পর্যন্ত নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে দলীয় ৪৭৪ রানে আউট হন তিনি। তার বিদায়ের পর রাজশাহী দ্বিতীয় ইনিংসে ৯ উইকেটে ৫০০ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে। দুই দলের সম্মতিতে ম্যাচের সমাপ্তি ঘটে ড্রয়ে।
ম্যাচ শেষে নিজের ব্যাটিং পরিকল্পনা নিয়ে সাব্বিরের বক্তব্যেও উঠে এসেছে দায়িত্ববোধের বিষয়টি। জানালেন, দেড়শ রান করার লক্ষ্য নিয়ে নামেননি তিনি।বরং চেষ্টা করেছেন ৩০০ থেকে ৪০০ বল খেলার। দলের চাহিদা ছিল ম্যাচ ড্র করা। তাই ব্যক্তিগত রান কিংবা বড় শটের চেয়ে প্রতিটি বল মোকাবিলা করাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। অনেক বল ছেড়ে দিয়েছেন, অপ্রয়োজনীয় শট খেলা থেকে বিরত থেকেছেন। সাব্বিরের এই ধৈর্যশীল ব্যাটিংই রাজশাহীকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখে।
অন্যদিকে কক্সবাজারে দ্বিতীয় রাউন্ডের একমাত্র জয়টি পেয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। বরিশাল বিভাগকে ইনিংস ও ১ রানে হারিয়েছে তারা। ম্যাচের শেষ দিনের শুরুতে বরিশালের দ্বিতীয় ইনিংসে সংগ্রহ ছিল ৪ উইকেটে ১৪৯ রান। ইনিংস ব্যবধানে হারের শঙ্কা থাকলেও রাফসান আল মাহমুদ ও মঈনুল ইসলামের ব্যাটিংয়ে কিছুটা আশা দেখেছিল দলটি। দুজনের প্রতিরোধে মধ্যাহ্নবিরতিতে যাওয়ার আগে ৪ উইকেটে ২২৬ রান তোলে বরিশাল।
কিন্তু বিরতির পরই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ৭২ রান করা রাফসান ফিরে যাওয়ার পর ৪১ রান করা মঈনুলও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। এরপর চট্টগ্রামের বোলারদের সামনে আর প্রতিরোধ গড়তে পারেনি বরিশাল। শেষ পর্যন্ত ২৯৩ রানে অলআউট হয়ে যায় তারা। চট্টগ্রামের বাঁহাতি স্পিনার আশরাফুল হাসান রোহান ৭৭ রানে পাঁচ উইকেট নিয়ে জয়ের ভিত গড়ে দেন। আরেক বাঁহাতি স্পিনার হাসান মুরাদ দুটি উইকেট নিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ২০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন।
এই জয়ে মৌসুমে প্রথমবার জয়ের স্বাদ পেল চট্টগ্রাম। ইনিংস ব্যবধানে জেতায় বোনাস পয়েন্টও পেয়েছে তারা। দুই ম্যাচ শেষে তাদের পয়েন্ট দাঁড়িয়েছে ১১। বিপরীতে প্রথম দুই ম্যাচেই হেরে কঠিন অবস্থায় পড়েছে বরিশাল।
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিলেট ও ঢাকা বিভাগের ম্যাচটি শেষ হয়েছে ড্রয়ে। শেষ দিনে দুই দলের ব্যাটারদের কাছ থেকে এসেছে দুটি শতক। সিলেটের আশরাফুল হাসান রিহাদ ১১২ রান করেন। অন্যদিকে ঢাকা বিভাগের আশিকুর রহমান ১০১ রানে অপরাজিত থাকেন।
পাঁচ উইকেটে ৪৩১ রান নিয়ে দিন শুরু করা সিলেটের প্রথম ইনিংস থামে ৪৯৬ রানে। ঢাকার লেগ স্পিনার আমিনুল ইসলাম পাঁচ উইকেট নিয়ে সিলেটের ইনিংস গুটিয়ে দেন। পরে ঢাকা দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেটে ২১৯ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে। ২৭১ রানের লক্ষ্য পেয়ে ম্যাচ জয়ের সুযোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত ২ ওভারে ১ উইকেটে ২ রান তুলে ড্র মেনে নেয় দুই দল।
সিলেট একাডেমি মাঠে ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের ম্যাচটিও ড্র হয়েছে। জয়ের জন্য ৩৭৩ রানের লক্ষ্য পেয়েছিল ময়মনসিংহ। হাতে ছিল প্রায় ৮০ ওভার। তবে ঝুঁকি না নিয়ে ৪ উইকেটে ১৮৯ রান তোলার পর ম্যাচের সমাপ্তি মেনে নেয় দুই দল। এর আগে রংপুর দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেটে ২৪৫ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করেছিল।
এনসিএলের দ্বিতীয় রাউন্ডে চার ম্যাচের তিনটিই ড্র হয়েছে। একমাত্র জয়টি চট্টগ্রামের। তবে ফলাফলের হিসাব ছাপিয়ে এই রাউন্ডে আলাদা করে আলোচনায় থাকবেন সাব্বির রহমান। দীর্ঘদিনের সেঞ্চুরি-খরা কাটানোর পর সামনে তার নতুন চ্যালেঞ্জ সিক্সেস ক্রিকেট। ৩০ ফুটের মাঠে ছয় ওভারের এই টুর্নামেন্ট নিয়ে অবশ্য বড় কোনো লক্ষ্য ঠিক করেননি তিনি। মজা করে জানিয়েছেন, ছক্কা মারার অভ্যাস তার পুরোনো; সে জন্য আলাদা অনুশীলনেরও প্রয়োজন নেই!
