এখানে মূল নীতিটি খুবই সহজ। রাষ্ট্রীয় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যে বিপুল পরিমাণ প্রমাণ ও তথ্য সংগ্রহ করে, সেগুলো ব্যবহার করে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা সংশোধন করা উচিত। তাহলে সময়ের সঙ্গে অর্জিত শিক্ষা বর্তমান ও ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারবে।
কোম্পানিগুলো যেমন প্রতিটি ক্লিক, কেনাকাটা ও ব্যর্থ লেনদেন থেকে গ্রাহকদের সম্পর্কে তাদের ধারণা আরো শাণিত করে, তেমনি রাষ্ট্রীয় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানও নাগরিকদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে, মূল্যায়ন করায় এবং বিপুলসংখ্যক বিশ্লেষক নিয়োগ করে। তার পরও অনেক সরকার কোনো নীতি গ্রহণের সময় স্পষ্টভাবে বলে না—কেন নীতিটি নেয়া হচ্ছে, এর ফলে কী পরিবর্তন হবে বলে তারা আশা করছে, সেই প্রত্যাশা নিয়ে তারা কতটা নিশ্চিত এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের প্রমাণ পাওয়া গেলে তারা আগের ধারণা বদলাবে।
চার বছর আগে আমরা বলেছিলাম, জনস্বার্থে তথ্যের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কিন্তু শুধু এটুকুতেই থেমে থাকলে চলবে না। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ না করে আরো বেশি তথ্য সংগ্রহ ও মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত কেবল আরো কিছু গুরুত্বহীন প্রতিবেদনই তৈরি করবে। নতুন কোনো সরকারি সেবা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু হতে পারে, এর ফলাফল পরিমাপ করা হতে পারে এবং মূল্যায়ন প্রতিবেদনও সংরক্ষণ করা হতে পারে। কিন্তু সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা অগ্রাধিকার বদলে গেলে আগের উদ্যোগ ও তার শিক্ষা সহজেই হারিয়ে যেতে পারে। তথ্য-প্রমাণ হয়তো কোথাও থেকে যাবে, কিন্তু তা ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তে কাজে লাগানোর মতো স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পরিণত হবে না।
এ দুর্বলতা এখন বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। গত জুলাইয়ে ১৬ জন নোবেলজয়ীসহ দুই শতাধিক অর্থনীতিবিদ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষক সতর্ক করে বলেছেন, এআই শিল্প বিপ্লবের চেয়েও বড় অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটাতে পারে, তাও অনেক কম সময়ের মধ্যে। অথচ এমন রূপান্তর সামাল দেয়ার জন্য সরকারগুলো প্রস্তুত নয়। আমাদের এখন জরুরিভাবে এমন একটি রাষ্ট্র দরকার, যা চলতে চলতে শিখতে পারবে এবং যা শিখবে তা মনে রাখতেও পারবে।
অবশ্য রাষ্ট্র পুরোপুরি স্মৃতিহীন নয়। সরকারি প্রশাসন, পরিসংখ্যান দপ্তর, নিরীক্ষা সংস্থা ও আর্কাইভে নানা তথ্য ও অভিজ্ঞতা সংরক্ষিত থাকে। সমস্যা হলো, এসব জ্ঞান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে থাকে, অনেকটাই নথিপত্র বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্মৃতির ওপর নির্ভর করে এবং নীতিনির্ধারণে সেগুলোর ব্যবহারও সীমিত। ফলে কোন সময়ে সরকার কী ধারণার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কেন নিয়েছিল, পরে কী ফল হয়েছিল এবং সেখান থেকে কী শিক্ষা পাওয়া গেছে—এসব তথ্য এক জায়গায় যাচাইযোগ্য ও সংশোধনযোগ্যভাবে সংরক্ষিত থাকে না।
এখানে মূল নীতিটি খুবই সহজ। রাষ্ট্রীয় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যে বিপুল পরিমাণ প্রমাণ ও তথ্য সংগ্রহ করে, সেগুলো ব্যবহার করে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা সংশোধন করা উচিত। তাহলে সময়ের সঙ্গে অর্জিত শিক্ষা বর্তমান ও ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারবে।
এজন্য প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সরকারি বিভাগগুলোকে নীতিগত হস্তক্ষেপ কী ছিল, কোন প্রমাণ ও মডেল ব্যবহার করা হয়েছিল, কী ফল প্রত্যাশা করা হয়েছিল, সেই প্রত্যাশা নিয়ে কতটা অনিশ্চয়তা ছিল এবং বিশ্লেষণের বাইরে গিয়ে কোনো মানবিক বিচার-বিবেচনা প্রয়োগ করা হয়েছিল কিনা—এসব নথিবদ্ধ করতে হবে। ফল জানা যাওয়ার আগেই পূর্বাভাসের সময় নথিভুক্ত করতে হবে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পরে সেই নথির সঙ্গে প্রকৃত ফলাফলও যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে নীতিটি পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয়েছিল কিনা, সে সম্পর্কিত প্রমাণও থাকতে হবে। এরপর রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার পূর্ববর্তী ধারণা সংশোধন করতে হবে অথবা সেটিই বহাল রাখতে হবে, যাতে একই বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্তটি হালনাগাদ ধারণার ভিত্তিতে নেয়া যায়।
নতুন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আগের ধারণা সংশোধন করার অর্থ এই নয় যে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। আবার ধারণা সংশোধন করলেই যে সরকার কোনো বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি নিশ্চিত হয়েছে, তাও নয়। তথ্য অস্পষ্ট হতে পারে, নীতি পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত নাও হতে পারে কিংবা পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। একটি সরকার যদি সেই অনিশ্চয়তাকে স্বীকার করে এবং বলে যেকোনো বিষয়ে তার আগের ধারণা এখন আর ততটা নিশ্চিত নয়, সেটিই প্রকৃত শেখার লক্ষণ। শুধু প্রতিবেদন জমা করে আগের অবস্থানকেই নিশ্চিত ধরে রাখার চেয়ে এ ধরনের সরকারই বেশি কার্যকরভাবে শেখে।
রাষ্ট্র যদি আগের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা কাজে না লাগায়, তাহলে বর্তমান জ্ঞান ব্যবহার করে যে ফল অর্জন করা সম্ভব ছিল, বাস্তবে তার চেয়ে কম অর্জন হয়। অর্থাৎ ভুলে যাওয়ারও একটি অর্থনৈতিক মূল্য আছে। সেই ক্ষতি হিসাব করলে প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি গড়ে তোলা আর বাড়তি খরচ বলে মনে হয় না; বরং তা কার্যকর বিনিয়োগে পরিণত হয়। এতে ব্যর্থ কর্মসূচি দ্রুত বন্ধ করা যায়, সফল কর্মসূচি বড় পরিসরে নেয়া যায় এবং কম অর্থে একই ফল কিংবা একই বাজেটে আরো ভালো ফল অর্জন করা সম্ভব হয়।
আমরা বলছি না যে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব যন্ত্র বা প্রযুক্তিবিদদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। এআই বা অন্য প্রযুক্তির কাজ হবে তথ্য বিশ্লেষণ করে সুপারিশ দেয়া, ফলাফল থেকে শেখা এবং সেই শিক্ষা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কাছে পৌঁছে দেয়া। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দায়িত্ব অবশ্যই সরকারি কর্মকর্তাদেরই থাকবে। কোনো ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা এআই মডেলের সুপারিশ না মানলে কেন তা মানা হয়নি, সেই কারণও নথিবদ্ধ করা উচিত। কারণ মানুষের সেই সিদ্ধান্তে এমন কোনো বাস্তব প্রেক্ষাপট বা তথ্য থাকতে পারে, যা মডেলের বিবেচনায় ছিল না এবং ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তে তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আমরা এটাও বলছি না যে অতীতের নথি ও অভিজ্ঞতা নতুন সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে বেঁধে রাখবে। নতুন সরকার আগের সরকারের সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ ও অভিজ্ঞতা পাবে, কিন্তু আগের সরকারের লক্ষ্য বা অগ্রাধিকার অনুসরণ করতে বাধ্য থাকবে না। প্রয়োজন হলে তারা বিদ্যমান মডেলকে প্রশ্ন করতে, ভুল বা বেআইনি নথি সংশোধন করতে এবং নীতির লক্ষ্য বদলাতে পারবে। তবে কেন এবং কীভাবে এসব পরিবর্তন আনা হলো, সেটিও নথিভুক্ত থাকতে হবে।
রাষ্ট্রীয় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত সরকারি পরিসংখ্যান, বাজেট ও নিরীক্ষার মতোই অতীতের সিদ্ধান্ত, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা সংরক্ষণের ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের মৌলিক অবকাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা। এ ব্যবস্থার লক্ষ্য কী হবে, কোন মানদণ্ডে তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, কারা তা দেখতে বা সংশোধন করতে পারবে এবং যেন এটি নাগরিক নজরদারির হাতিয়ার বা নির্ধারিত সীমার বাইরে ব্যবহৃত না হয়—এসব নিয়ম রাষ্ট্রকেই ঠিক করতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি তৈরিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেয়া যেতে পারে, তবে তথ্য, সিদ্ধান্তের নথি এবং সেখান থেকে পাওয়া শিক্ষা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণেই থাকতে হবে।
এ প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে দায়িত্বের সুস্পষ্ট ও শৃঙ্খলাবদ্ধ বিভাজন প্রয়োজন। সিদ্ধান্ত কীভাবে নথিভুক্ত হবে, ফলাফল পর্যালোচনার সময়সূচি কী হবে, মডেল কীভাবে ব্যবহার হবে এবং নিরীক্ষকরা কীভাবে তথ্য পাবেন—এসব বিষয়ে সরকারি বিভাগগুলোর অভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করা উচিত। এরপর প্রযুক্তি কোম্পানি বা সরকারের নিজস্ব কারিগরি প্রশাসন সেই মানদণ্ড অনুসারে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বাধীন মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যাচাই করবে ফলাফল প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়েছে কিনা। এক্ষেত্রে পরিসংখ্যানগত অনিশ্চয়তাও বিবেচনায় নিতে হবে এবং পর্যবেক্ষিত ফলাফলের পেছনে সত্যিই ওই নীতির ভূমিকা ছিল কিনা, প্রমাণ তা সমর্থন করে কিনা, সেটিও যাচাই করতে হবে। প্রতিটি ধাপের ফলের ভিত্তিতে এরপর তথ্য হালনাগাদ করা যাবে। এ ধরনের অংশীদারত্ব রাষ্ট্রের শেখার সক্ষমতা বাড়াবে, কিন্তু রাষ্ট্রের নিজস্ব বিচার-বিবেচনা অন্যের হাতে তুলে দেবে না। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা এবং নথি সংশোধনের অধিকার অবশ্যই রাষ্ট্রের কাছেই থাকতে হবে।
অনেকের ধারণা, যে সরকারের হাতে সবচেয়ে বড় এআই মডেল বা সবচেয়ে বেশি তথ্য থাকবে, এআই থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধাও তারাই পাবে। কিন্তু প্রকৃত সুবিধা পাবে সেই সরকার, যারা অতীতের শিক্ষা সংরক্ষণ করতে পারে, নিজেদের সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন ও যাচাইয়ের সুযোগ দেয় এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত উন্নত করে। যে রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি কাজ স্বয়ংক্রিয় করতে পারে, সেটিই সবচেয়ে বুদ্ধিমান নয়; বরং যে রাষ্ট্র অতীতের শিক্ষা মনে রাখে এবং তা ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তে কাজে লাগাতে পারে, সেটিই প্রকৃত বুদ্ধিমান রাষ্ট্র।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
ক্রিস্টোফার এ পিসারাইডিস: অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অর্থনীতির অধ্যাপক
ফাদি ফারা: হোয়াইটশিল্ডের প্রতিষ্ঠাতা, হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের সাবেক প্রভাষক
