স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি শুরু হলেও অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটের পরিবেশ নিয়ে সংশয় কাটছে না। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সময়সূচি, নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ, কমিশনের স্বাধীনতা এবং সরকার ও ইসির মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দল দুটির নেতাদের আশঙ্কা, নির্বাচনের দিনক্ষণ নির্ধারণ থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করা পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা ও সমন্বয়হীনতা থাকলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে সংকট তৈরি হতে পারে। তবে এসব সংশয় সত্ত্বেও নির্বাচনী প্রস্তুতি থেকে সরে আসছে না দল দুটি। সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই, সাংগঠনিক তৎপরতা ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে তারা। তাদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নয়; সরকার ও নির্বাচন কমিশন কতটা নিরপেক্ষতা, সক্ষমতা ও সদিচ্ছার পরিচয় দিতে পারে, তারও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
গত ১২ অক্টোবর নির্বাচন ভবনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় নির্ধারণসংক্রান্ত সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ জানান, ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন শুরু হবে। এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি, ২৯ এপ্রিল, ১৩ মে ও ২৭ মে পর্যায়ক্রমে বাকি চার ধাপের ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে ১২ নভেম্বর থেকে নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনার কথা জানালেও পরে তা পরিবর্তন করে কমিশন। সময়সূচি ঘোষণার পরও কোন এলাকায় কখন ভোট হবে এবং দেশের সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন কীভাবে সম্পন্ন করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা চাইছে বিরোধী দলগুলো। তাদের মতে, শুধু কয়েক ধাপের ভোটের তারিখ ঘোষণা যথেষ্ট নয়; নির্বাচন আয়োজনের সামগ্রিক পরিকল্পনা, আইনগত প্রস্তুতি ও মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনাও স্পষ্ট করতে হবে।
সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারছে না। সরকারের প্রভাবমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালনের পরিবেশও নেই। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দলীয় ব্যক্তিদের পদায়ন ও প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে দলীয়করণ নির্বাচনে সমান সুযোগ তৈরির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন তিনি। গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ভোটার ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা, নির্বাচনী বিধিবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন এবং সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এসব পদক্ষেপ ছাড়া গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন কঠিন।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, এখন নির্বাচন কমিশনের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী ভোট আয়োজনের পাশাপাশি নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দেওয়া। একই সঙ্গে ভোটার ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা এবং সব দলের সমান অংশগ্রহণের পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিরোধী জোটের নেতারা জানান, শুধু ইউনিয়ন পরিষদের পাঁচ ধাপের নির্বাচন নয়, পুরো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নির্বাচনের একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ থাকা উচিত। দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সামগ্রিক পরিকল্পনা জরুরি। নির্বাচনের ধাপ ও তারিখ ঘোষণার পাশাপাশি কোন কোন প্রতিষ্ঠানে কখন ভোট হবে, সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। তবে নির্বাচনে অংশ
নেওয়ার প্রস্তুতির পাশাপাশি সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করার দাবি। সরকারকে সতর্ক করে বিরোধী জেটের নেতারা বলেন, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ না হলে আন্দোলনের পথে যেতে পারেন তারা। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে কঠিন আন্দোলনের হুশিয়ারি দেন।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জামায়াত সংশয় প্রকাশ করলেও রাজনৈতিক দল হিসেবে স্থানীয় বা জাতীয় যে কোনো নির্বাচনের প্রস্তুতি জামায়াত সারা বছর ধরেই নেয় এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি জোরেশোরে শুরু করেছেন বলে আমাদের সময়কে বলেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম। সারাদেশে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রস্তুত হতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারাও মাঠপর্যায়ে তাদের কার্যক্রম অনানুষ্ঠানিকভাবে শুরু করে দিয়েছে। দলের বিভিন্ন এলাকার ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের সব সিটি করপোরেশনে মেয়র পদের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে সংশয় রয়েছে নিঃসন্দেহে, তবে জামায়াত বা তার রাজনৈতিক শরিক দলগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে আসবে না।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ আমাদের সময়কে বলেন, নির্বাচন কমিশন সরকারের অঙ্গুলিহেলনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে, যা স্বাধীন কমিশনের প্রতি চরম অবজ্ঞার বহিঃপ্রাকাশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গটি এখনও নিষ্পত্তি করেনি কমিশন। কমিশন কী ধরনের আইনগত সংস্কার করেছে বা করেনি, তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনা হলে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি ও কমিশনের সক্ষমতা সম্পর্কে জনগণ স্পষ্ট ধারণা পাবে। নয়তো কমিশনের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হবে। কমিশন আদৌ নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন করতে পারবে কিনা সংশয় রয়েছে। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের অংশীদার হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পৃথকভাবে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত ও এনসিপিসহ অন্য শরিকরা। কারণ স্থানীয় সরকারের বিপুলসংখ্যক পদে সে ধরনের সমঝোতা বাস্তবসম্মত নয়। অতীতে কখনও জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন হয়নি। তবে স্থানীয় পর্যায়ে কোথাও সমঝোতা হলে কেন্দ্র থেকে কোনো বাধা থাকবে না।
এ নিয়ে গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিক দল এনসিপি নির্বাচনের রোডম্যাপ আরও সুনির্দিষ্ট করার দাবি জানিয়ে দলটির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার আমাদের সময়কে বলেন, কোন ধাপে কোন জেলার ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হবে, তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। প্রথম ধাপের তারিখ ঘোষণার পাশাপাশি পরবর্তী ধাপগুলোর এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনাও প্রকাশ করা প্রয়োজন। তার মতে, নির্বাচনের দিনক্ষণ নির্ধারণ থেকে শুরু করে সার্বিক প্রস্তুতিতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। তিনি মনে করেন, আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে সরকার ও কমিশনের সামনে জনগণের আস্থা অর্জনের সুযোগ তৈরি করেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগানো হবে কিনা, তা তাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। নির্বাচন পেছানোর আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি। তবে তার দল শিগগিরই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করবে।
