Published on
:
3 min read
জিষ্ণু বসু
সুপ্রিম কোর্টে প্রাথমিক ভাবে ধাক্কা খেয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির প্রস্তাবিত প্রদর্শন। কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইন্ডি জোটও তাদের পক্ষেই আছে আপাতত। ভারতীয় গণতন্ত্রের যে তিনটি স্তম্ভ, আইন ব্যবস্থা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব আর প্রশাসন, সবাইকেই আক্রমণ করছে আরশোলা বাহিনী। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক স্তম্ভকে নড়িয়ে দিয়েছে। এবার প্রশাসন। জ্ঞানেশকে আক্রমণের লক্ষ্য চরিতার্থ হলে তৃতীয় স্তম্ভও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এত তোড়জোড়।
বিশ্ববাজার-শক্তি আর কালচারাল মার্কসিজ়ম আজ হাতে হাত ধরে চলছে। রাজনৈতিক হতাশা ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী দলগুলিকেও এই শক্তির পাশে দাঁড় করিয়েছে। ভারতীয় গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার জন্য এই মিলিত শক্তি গণতন্ত্রের সব ক’টি অস্ত্রকে ব্যবহার করবে। তার পর আর গণতন্ত্র, মানবতা, বাক্-স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার, ছাত্র-যুবদের জন্য সহমর্মিতা, কিছুই থাকবে না। ভিয়েতনামের যুদ্ধ থেকে চিনের তিয়েন-আনমেন স্কোয়্যার, সর্বত্রই একই দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়েছে। গ্লোবাল মার্কেট ফোর্স আর টোটালিটারিয়ান মার্কসিজ়মের মানবতা, সহনশীলতা আর বাক্-স্বাধীনতার আসল চেহারা বিশ্ববাসী দেখে নিয়েছেন। একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যায় এই চক্রান্তের সঙ্গে যুবমানস, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রভৃতির বিশেষ সম্পর্ক নেই। প্রথমে দেখা যাক এসআইআর সত্যি সত্যিই ভোটের ফল পাল্টে দিচ্ছে কি না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলটাই দেখা যাক। ধরা যাক এসআইআর প্রক্রিয়ায় যতজন ভোটারের নাম বাদ গেছে, তারা সকলেই ভারতীয় জনতা পার্টির বিরোধী, এবং তারা সকলেই একযোগে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীকেই ভোট দিত। তা হলেও তৃণমূল কংগ্রেসের ঝুলিতে মাত্র ২৬টি আসন বেশি আসত। বাকি ১৮১টি কেন্দ্রে এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা জেতার ব্যবধানের থেকে কম। এসআইআর আদৌ না হলেও ভোটে বিজেপি ১৮১টি আসনে জিতত।
জ্ঞানেশ কুমার ২০২১ সালে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ছিলেন না। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন দেখেছে। অবাধ রিগিং দেখেছে। নির্বাচনের ফল বার হওয়ার পরে পরাজিত দলের উপর বিজয়ী দল মধ্যযুগীয় বর্বরতা নামিয়ে এনেছিল। ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলাতেই ছ’জন রাজনৈতিক কর্মীর প্রাণ গেছে। তাই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বুঝেছে, জ্ঞানেশ কুমার কী করতে পারেন। নানুর বা সাঁইথিয়ার যে মানুষটা গত পাঁচ বছর নিজের স্ত্রীর বা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারেনি, সে জানে জ্ঞানেশ কী করেছেন। এবার নির্বাচনে একজন রাজনৈতিক কর্মীরও প্রাণ যায়নি, কোনও মহিলার সম্মানহানি হয়নি। শাকিল আহমেদের জন্ম বাংলাদেশে। নদিয়ার করিমপুর সীমান্ত দিয়ে তিনি ভারতে এসেছিলেন ১৯৯৮ সালে। বামফ্রন্টের সূর্য তখন মধ্য গগনে। দেশের সুরক্ষা, অর্থনৈতিক অচলাবস্থা ইত্যাদিকে উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে চলছিল অনুপ্রবেশ। শাকিল পার্টি-বাবুদের ধরে ভোটার কার্ড করিয়েছিল। কিন্তু ভোটার কার্ড করেই ক্ষান্ত হয়নি শাকিল। শাকিল একের পর এক স্লিপার সেল বানিয়েছে নদিয়া, বর্ধমান জুড়ে। এর পর রাজ্যের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়ে গেল। কোনও রকম পর্যবেক্ষণ ছাড়াই ১০ হাজার ৫০০টি খারিজি মাদ্রাসার অনুমোদন দেওয়া হলো। পূর্ব বর্ধমানের সিমুলিয়ার মতো খারিজি মাদ্রাসা থেকে শাকিল সরল মেয়েদের স্লিপার সেলে নিয়োগ করেছিল। খাগড়াগড়ে ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর ইম্প্রোভাইজ়ড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসের কারখানায় বিস্ফোরণ হওয়ার পরে সারা দুনিয়া এত সব জানতে পারে। এই মামলার মূল অপরাধী কৌসরকে এনআইএ ধরেছিল বেঙ্গালুরু থেকে। বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার ছেলে কৌসর ভারতে এসে হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনাতে সক্রিয় ছিল। ২০২১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কৌসর বা বোমা মিজানের ২৯ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ হয়। একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতের কি অধিকার নেই এই শাকিল, কৌসরদের খুঁজে বার করার? জ্ঞানেশ কুমার সেই অন্বেষণের প্রথম পদক্ষেপটি করেছেন। তাই কি এত আতঙ্ক?
কালচারাল মার্কসিজ়মের ‘রেজ়িস্ট’, ‘রিজেক্ট’, ‘রেবেল’, এই তিনটি ‘আর’-এর প্রক্রিয়া চালানোর জন্য শুধু ইস্যুর প্রয়োজন। প্রধান বিচারপতির বক্তব্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস বা এসআইআর, এই তিনটি ‘আর’-এর ছুতো মাত্র। এ সব শেষ হলে অন্য ছুতো আসবে। তার ব্লু প্রিন্ট হবে, উপস্থাপনের মহড়া হবে, কালচারাল মার্কসবাদ-লালিত বাস্তুতন্ত্র-নিয়ন্ত্রিত মূলধারার প্রচার মাধ্যম বা সমাজ মাধ্যম তাকে প্রচার করবে। হাজারটি ঘটনার মধ্যে একটি মাত্র স্থানে যদি কোনও মহিলা প্রদর্শনকারীকে গ্রেপ্তারের সময়ে মহিলা পুলিশ অনুপস্থিত থাকে, তবে তার ভিডিয়ো ফুটেজ ভাইরাল করা হবে। আজ মার্কিন পুঁজিবাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ ভারত। তথ্যপ্রযুক্তি পরিকাঠামো যদি সম্পূর্ণ মার্কিন প্রভাব মুক্ত হয়, তবে ইরানের মতো, কোনও সামরিক স্পর্শকাতর মূহূর্তে ভারতকে বিপদে ফেলা যাবে না। মার্কিন নিষেধের পরোয়া না করে রাশিয়া থেকে তেল নেওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। খনিজ তেল হাতে না থাকলে মার্কিন ডলারকে কে পাত্তা দেবে? তাই আত্মনির্ভর বিকশিত ভারত মার্কিন পুঁজিবাদের রাত্রির ঘুম কেড়ে নিয়েছে। তাই তারা ভারতে অস্থিরতা ছড়াতে তথাকথিত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে মুড়ি-মুড়কির মতো ডলার ছড়াচ্ছে। জেন জ়ি নামে একটা বাজার তৈরি করার চেষ্টা করছে। এই অসাধু প্রচেষ্টার সঙ্গে ভারতের ৪১ কোটি যুব সমাজের উন্নয়ন বা উত্তরণের কোনও সম্পর্ক নেই।
লেখক সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজ়িক্সে কর্মরত। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
