সৌদি আরবের মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া প্রবাসী যুবক নজরুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিরামপুরে বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। নজরুল ওই গ্রামের আব্দুল বাছিরের বড় ছেলে। ৪ সন্তানের মধ্যে বড় নজরুলকে হারিয়ে দিশাহারা পরিবার। পরিবারের অভিযোগ তাদেরকে না জানিয়েই (১৪ অক্টোবর) বুধবার অতি গোপনে নজরুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
দীর্ঘ ৩ বছর তিন মাস নজরুল কারাগারে থাকলেও এর কারণ জানতে পারেনি পরিবার। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ পরিবারের সদস্যদের। গত বুধবার নজরুলের মৃত্যুর খবর শুনেই মারা যান তার আপন ফুফু। এই ঘটনায় বাকরুদ্ধ পরিবার।
বিজ্ঞাপন
স্বজনরা জানান, পরিবারের সুখ আর একটু স্বাচ্ছন্দ্যের আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন নজরুল ইসলাম (২০)। সেখানে যাওয়ার ৬ মাসের মাথায় মক্কা নগরীর একটি মসজিদে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কাজের অভিযোগ এনে দুইজনকে গ্রেফতার করে দেশটির পুলিশ। নজরুলকে গ্রেফতারের খবর জেনেছিল পরিবার, কিন্তু কী কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে তা তারা জানতেন না। পরের তিন বছর তিন মাস জেলে বন্দি থাকার পর, গত বুধবার নজরুল ইসলাম ওই তরুণীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে দেশটি সরকার।
নজরুলের মা রহিমা বেগম জানান, জেলে থাকার পরও প্রতি রোববার পরিবারের সঙ্গে কথা বলতেন নজরুল ইসলাম। কিন্তু হঠাৎ করে পরিবারের সদস্যদের কাউকে না জানিয়ে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ না দিয়ে গত বুধবার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। গণমাধ্যমের খবরে বুধবার পরিবারের সদস্যরা প্রথমে নজরুলের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
নজরুলের বাবা আব্দুল বাছির বলেন, আমার ছেলে কী কারণে জেলে ছিল তা আমি এখনো জানি না। হঠাৎ ফেসবুকে তার মৃত্যুর সংবাদ দেখতে পেলাম। নজরুলের মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে তার আপন ফুফু আবেদা বেগম বুধবার রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি বলেন, আমার ছেলেকে ৭ লাখ টাকা ঋণ করে পরিবারের হাল ধরতে প্রবাসে পাঠিয়েছিলাম। পাঠানোর ৬ মাস পর থেকেই সে জেলে ছিল। এরমধ্যে দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। ঋণদাররাও আমাকে চাপ দিচ্ছে। আমি আমার ছেলের মরদেহ দেশের মাটিতে ফিরে পেতে চাই। আমার ছেলেকে যদি বিনা কারণে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে থাকে, এর বিচার আমি চাই।
এদিকে নজরুলের মৃত্যুদণ্ডের খবর পাওয়ার পর থেকে গ্রামবাসী তাদের বাড়িতে নিয়মিত আসা যাওয়া করছেন। তাদের পরিবারের খোঁজ নিচ্ছেন। জানাচ্ছেন সমবেদনা।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় বাসিন্দা ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সিনিয়র সহসভাপতি গাজী নিয়াজুল করিম বলেন, নজরুলকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, এমন কোনো অপরাধ সে করেছে বলে মনে করছি না। সরকারের কাছে আবেদন, ওই দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে সঠিক তথ্য উদঘাটন করা হোক। এখন পর্যন্ত যা দেখছি, বাংলাদেশ দূতাবাসের যথেষ্ট অবহেলা রয়েছে। তারা যদি যোগাযোগ করত তাহলে এই পরিস্থিতি হতো না। কিছুদিন আগে শ্রীলঙ্কার এক নাগরিকের এমন সাজা হয়েছিল, কিন্তু তাদের দেশের দূতাবাস ব্যবস্থা নিয়ে তার নাগরিককে দেশে নিয়ে গিয়েছিল। এখন পর্যন্ত তার পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করেনি কেউ।
গ্রামের বাসিন্দা রাহাত ও মাইনুদ্দিন দাবি করেন, সৌদি আরব সরকার কট্টর নীতি থেকে উদারনীতিতে এসে সিনেমা হলসহ অনেক কিছুই উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে কট্টর নীতি থেকে রক্ষণ নীতিতে এসে কিছুটা সংশোধন করারও প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা। এছাড়া আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন তারা। নজরুলের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য দুই দেশের সরকারের কাছে অনুরোধ জানান তারা।
বিজ্ঞাপন
এই বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকেও কোনো আবেদন করা হয়নি৷ মরদেহ দেশে এলে, যেহেতু তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা নিয়ম অনুযায়ী সহায়তা করা হবে।
আবুল হাসনাত মো. রাফি/এফএ
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
