স্বামী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভালো পজিশনে আছেন। স্ত্রী এমএ পাস করলেও তাকে চাকরি করতে দেননি, কারণ ‘আমি তো আছি’, ‘সব তো ভালো চলছে, অসুবিধা কি?’ স্ত্রীকে সংসারে মন দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হলো, শ্বশুরবাড়ির সবাই খুব খুশি। বউ সবার সেবায় নিবেদিত। সংসারে দুটি সন্তান হলো। স্ত্রী যখন মধ্য চল্লিশে তখন তার স্বামী হঠাৎ রোড অ্যাক্সিডেন্টে পঙ্গু হয়ে পড়লেন। এখন? কে ধরবে সংসারের হাল? এই চিত্রটা কি খুব অচেনা আমাদের সমাজে?
সেই কবে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, ‘আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।’ অথচ এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও কিছু মানুষ মনে করে, সংসারের জন্য অল্পশিক্ষিত বউই ভালো। অনেক স্বামী কর্মজীবী বউ চাইলেও পরিবার অনেক ক্ষেত্রে সুশিক্ষিত, উচ্চশিক্ষিত ও কর্মজীবী মেয়েকে বউ হিসেবে চায় না। কিছু পরিবারে বিয়ের পাত্রী হিসেবে উচ্চশিক্ষিত মেয়েকে বিয়ে না করার জন্য উৎসাহিত করা হয়। এটি আমাদের সমাজের একটি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল সামাজিক বাস্তবতা। অনেক পরিবারের এখনও শিক্ষিত মেয়েকে পুত্রবধূ হিসেবে না চাওয়ার পেছনে কিছু নির্দিষ্ট মানসিকতা, সামাজিক ধারণা এবং ভয় কাজ করে। এসবের মূল কারণ হলো বউয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকার ভয়। কিছু সংকীর্ণমনা মানুষ মনে করে উচ্চশিক্ষিত মেয়েরা স্বাধীনচেতা হয়। তারা সহজেই পরিবারের সব সিদ্ধান্ত বা চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম মেনে না-ও নিতে পারে, যার ফলে পরিবারে তাদের নিজেদের কর্তৃত্ব বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর একটা ভয় কাজ করে। এ ছাড়াও সাংসারিক কাজের প্রত্যাশা করে বেশি। অনেক পরিবারে এখনও আশা করা হয় যে পুত্রবধূ ঘরের সব কাজকর্ম সামলাবে। তাদের ধারণা থাকে, উচ্চশিক্ষিত বা কর্মজীবী মেয়েরা ঘরের কাজে বা পরিবারের সদস্যদের সেবায় পর্যাপ্ত সময় দিতে পারবে না। ঘরের বউয়ের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিতে চায় না। শিক্ষিত মেয়েরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয় এবং যেকোনো অন্যায় বা অযৌক্তিক বিষয়ে প্রতিবাদ বা নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারে।
কোনো কোনো পরিবার এমন পুত্রবধূ চায় যারা প্রশ্নহীনভাবে সবকিছু মেনে নেবে। সমাজে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা আছে যে, কম শিক্ষিত মেয়েরা যেকোনো পরিস্থিতিতে বা যৌথ পরিবারে বেশি ‘মানিয়ে’ নিতে পারে, যা শিক্ষিত মেয়েদের ক্ষেত্রে কঠিন হতে পারে। অবশ্য কম শিক্ষিত বা অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল নারীদের কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না বিধায় নানা অপমান ও অত্যাচার সয়েও সংসার আঁকড়ে থাকে। তবে বর্তমান সময়ে এই মানসিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। এখন বহু পরিবার শিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী মেয়েদেরই তাদের পরিবারের জন্য প্রাধান্য দিচ্ছে, কারণ একজন শিক্ষিত মা একটি পুরো পরিবার ও পরবর্তী প্রজন্মকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারেন। ব্যতিক্রম তো সব ক্ষেত্রেই আছে। তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে, অসুখী হওয়ার পার্সেন্টেজ অশিক্ষিত মেয়েদের মধ্যেও বিদ্যমান। তবে প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে নম্র ও ভদ্র বানায়। আর কে না জানে যে নম্র-ভদ্র এবং শিক্ষিতরা সর্বক্ষেত্রেই ভালো হয়। তবে আমাদের সমাজে ‘শিক্ষিত মেয়ে’ শব্দটা অনেক সময় নেগেটিভ অর্থেই ব্যবহৃত হয়। যদিও শিক্ষা কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়, বরং একজন শিক্ষিত মেয়ে যখন মা হয়, সে শুধু তার সন্তানকে খাওয়ানো বা পরানো নয়, বরং তাকে নৈতিকতা, যুক্তি, সহমর্মিতা শেখাতে পারে তার জ্ঞানের আলোকে। কর্মজীবী নারী সংসারে সহযোদ্ধা, কোনো প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
শিক্ষা এবং প্রফেশন একটি মেয়ের পরিচিতি। যে আয় করে সে জানে বাজেট তৈরি ও খরচের হিসাব। মেয়েটির আর্থিক স্থিতিশীলতা তাকে মানসিকভাবে মজবুত করে। তার এই হিসাব জানার কারণে সংসার আরও সুন্দরভাবে গুছিয়ে রাখতে পারে, কারণ বাইরের পরিবেশ সম্পর্কেও তার বাস্তবিক জ্ঞান থাকে, স্বামীর সব পরিস্থিতিও সে বুঝতে পারে, আর সন্তানদেরও ভালোভাবে লালন-পালন করতে পারে। একজন উপার্জনক্ষম নারী হতে পারে তার পরিবারের সদস্যদের নির্ভরতার স্থান। সে সংসারের হাল ধরে, সন্তানদের মানুষ করার জন্য চেষ্টা করে, এটা তার অপরাধ নয়। একজন সুশিক্ষিত নারী সবচেয়ে আগে বোঝে যে সংসার সচ্ছল না হলে সে সংসারে সুখ থাকে না। তাই শিক্ষিত-অশিক্ষিত-নির্বিশেষে আর্থিক সচ্ছলতা প্রয়োজন। আর প্রয়োজনই মানুষকে ঠেলে দেয় তার কর্মযজ্ঞে। কোনো পরিবার যখন বিপদে পড়ে তখন কতজন আত্মীয় বা সমাজের কতজন লোক এগিয়ে আসে? যার সংসার, বিপদ তাকেই সামলাতে হয়। সহযোগিতার জন্য তখন কাউকে পাশে পাওয়া যায় না। তখন স্বামীর পাশে তার বউকেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
শিক্ষা একজন নারীর সৌন্দর্যকে পূর্ণতা দেয়, পাশাপাশি নম্রতা, ভদ্রতা, বোঝাপড়া ও সহমর্মিতা সংসারে শান্তি আনে। দায়িত্ববান শিক্ষিত নারীই সংসারের মূল্যবোধ ও বিশ্বাসে হয়ে ওঠেন একজন আদর্শ জীবনসঙ্গী।
