ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী দেশে শিক্ষকের শরীরে আঘাত করার সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে৷ কালনী হিড়নাল উচ্চবিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়ে বিরোধের জেরে এক সহকারী শিক্ষককে থাপ্পড় মারার অভিযোগ উঠেছে ওয়ার্ড বিএনপির এক নেতার বিরুদ্ধে৷ গতকাল বুধবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে কালনী হিড়নাল উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে এ ঘটনা ঘটে৷ এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে৷
অভিযুক্ত আবজাল মোল্লা দাউদপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি৷ অভিযোগকারী একরামুন্নেছা বিউটি ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক৷
এ ঘটনায় আবজাল মোল্লাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রূপগঞ্জ থানা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমান৷ জবাব সন্তোষজনক না হলে আবজাল মোল্লার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে – এমন আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি৷
শিক্ষককে পেটানোয় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আটক
অন্য ঘটনাটি গত সোমবার, অর্থাৎ ১২ অক্টোবরের৷ বগুড়ায় শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষককে মারধর করে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র রিয়াদ ইসলাম কিরন৷ গতকাল বুধবার তাকে আটক করে পুলিশ৷
পুলিশ ও বিদ্যালয় সূত্র প্রথম আলোকে জানায়, গত সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে বিদ্যালয় ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে বগুড়া আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সামনে বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের সহকারী শিক্ষক আবু রায়হানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে৷
ক্লাসে অতিরিক্ত দুষ্টুমি করায় রিয়াদকে সতর্ক করেছিলেন শিক্ষক আবু রায়হান৷ একই সঙ্গে তার অভিভাবককে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসতে বলেছিলেন তিনি৷ এর জের ধরে ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শিক্ষককে মারধরের অভিযোগ ওঠে৷
লাঠির আঘাতে শিক্ষক আবু রায়হানের থুতনি কেটে যায়৷ কাটা জায়গায় আটটি সেলাই দিতে হয়েছে৷ এ ছাড়া তার ঘাড়েও গুরুতর জখম হয়েছে৷ ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে৷ পরে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলক ছাড়পত্র (টিসি) দিয়ে বহিষ্কার করে৷ এ ঘটনায় থানায় অভিযোগও করা হয়৷

সারা দেশে কতজন?
সারাদেশে শিক্ষকদের ওপর মব সৃষ্টি করে হামলা, নানাভাবে অপমান করা এবং পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা নিয়ে ২০২৫ সালের ১৮ এপ্রিল ‘শিক্ষকদের আর কত অপমান!' শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ডয়চে ভেলে৷ ডয়চে ভেলে বাংলার ঢাকা প্রতিনিধি হারুন অর রশিদ স্বপনকে তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়র সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ‘‘সারা দেশে এ পর্যন্ত অন্তত দুই হাজার শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষককে এভাবে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে৷ তাদের মধ্যে ৮০০ শিক্ষক চাকরি ফিরে পেতে আদালতে গিয়েছেন৷ শুধু ঢাকা শহরেই পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন দুই শতাধিক শিক্ষক৷ এই শিক্ষকরা বেতনও পাচ্ছেন না৷'' তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, ‘‘যাদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে, তাদের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যাবে না, তাদের সবেতন চাকরি ফিরিয়ে দেয়া হতে পারে৷''
কিন্তু ‘শিক্ষকদের আর কত অপমান!'- শিরোনামের প্রতিবেদনটি প্রকাশের ছয়দিন পর (২৪ এপ্রিল ২০২৫) এক নারী শিক্ষককে লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে রাজশাহীতে৷ সেদিন ‘রাজশাহীতে কলেজে ঢুকে নারী শিক্ষককে লাঞ্ছনা, অভিযোগ বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে' শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার প্রথম আলো৷ প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘‘রাজশাহীর দাউকান্দি সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ ও নারী শিক্ষককে (প্রদর্শক) মারধর ও কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়েছে৷ হামলাকারীরা নারী প্রদর্শককে মারধর করে চুল ধরে বাইরে টেনে নিয়ে যায়৷ গতকাল বৃহস্পতিবার কলেজের স্নাতক (ডিগ্রি) পরীক্ষার সময় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে হামলাকারীরা কলেজ প্রাঙ্গণে ঢুকে এ ঘটনা ঘটিয়েছে৷''
নারী শিক্ষককে মারধর করে চুল ধরে বাইরে টেনে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে৷ কলেজের নারী প্রদর্শক আলিয়া খাতুন (হীরা)-কে স্যান্ডেল দিয়ে পেটানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে৷
প্রত্যক্ষদর্শীরা প্রথম আলোকে জানান, স্থানীয় একজন মৎস্য ব্যবসায়ী বিএনপির কর্মী শাহাদত আলী প্রদর্শক আলিয়া খাতুনকে স্যান্ডেল দিয়ে পিটিয়েছেন৷ শাহাদত আলীর ছেলে লিটন ও কর্মচারী মাহবুর কলেজের অধ্যক্ষ ও প্রদর্শক আলিয়া খাতুনের ওপর হামলা চালান৷ হামলায় নেতৃত্ব দেন জয়নগর ইউনিয়নের চার নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি এজদার, জয়নগর ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি জয়নাল আবেদীন, ব্যবসায়ী আফাজ উদ্দিন প্রমুখ৷
‘শিক্ষক, অধ্যাপকদের জোর করে পদত্যাগ করানো হচ্ছে‘
শিক্ষকদের পেটানো তারপরও থামেনি৷
চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি ‘মাদারীপুরে বিদ্যালয়ে প্রবেশের সময় শিক্ষককে হাতুড়িপেটা, প্রতিবাদে মানববন্ধন' শিরোনামের এক খবরে প্রথম আলো জানায়, ‘‘মাদারীপুরে বিদ্যালয়ে প্রবেশের সময় এক স্কুলশিক্ষককে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছে৷ আজ সোমবার সকালে শহরের চরমুগরিয়া মার্চেন্টস উচ্চবিদ্যালয়ের পেছনের ফটকে এ ঘটনা ঘটে৷ আহত অবস্থায় অনাদি বিশ্বাস (৩৫) নামের ওই শিক্ষককে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে৷''
এরপর চলতি বছর ৯ জুনের আরেক খবরে শিরোনাম ‘সাতক্ষীরায় শ্লীলতাহানির অভিযোগ তুলে ‘মব' করে শিক্ষককে পিটিয়ে জখম'৷
সেই খবরে বলা হয়, ‘‘সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ তুলে মব সৃষ্টি করে পিটিয়ে জখম করার ঘটনা ঘটেছে৷ গতকাল সোমবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত উপজেলার একটি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটে৷''
‘‘ভুক্তভোগী ওই বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক৷ তাকে প্রথমে শ্রেণিকক্ষে চড়-থাপ্পড় মারার পর শিক্ষকদের কক্ষে নিয়ে লোহার রড দিয়ে পেটানো হয়৷''
এসিবি/ জেডএইচ (প্রথম আলো, ডয়চে ভেলে)
