প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার · ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:০০ অপরাহ্ন
কলাগাছের আঁশ থেকে সুতা, সেই সুতা দিয়ে শাড়ি। ২০২৩ সালে ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগে তৈরি ‘কলাবতী’ শাড়ি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা হয়েছিল। শাড়িটি বুনেছিলেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের তাঁতশিল্পী রাধাবতী দেবী। তবে সম্ভাবনা জাগিয়েও বেশিদূর এগোয়নি কলাগাছের সুতা থেকে শাড়ি তৈরির উদ্যোগ। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাবে থমকে আছে এই শিল্পের বিকাশ।
কলাগাছের আঁশ থেকে সুতা, সেই সুতা দিয়ে শাড়ি। ব্যতিক্রমী এই ভাবনা থেকেই ২০২৩ সালে তৈরি হয়েছিল ‘কলাবতী’ শাড়ি। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের তাঁতশিল্পী রাধাবতী দেবীর হাত ধরে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুললেও উদ্যোগটি আর এগোয়নি। সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে থমকে আছে 'কলাবতী' শাড়ির সম্ভাবনাময় শিল্প।
তবে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হলে কলাগাছের সুতা থেকে শাড়ি তৈরির একটি সম্ভাবনাময় শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব আশা রাধাবতী দেবীর।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের এপ্রিলে বান্দরবান জেলা প্রশাসকের আমন্ত্রণে প্রথমবারের মতো কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি বোনেন রাধাবতী দেবী। দীর্ঘ সময় ও পরিশ্রমে শাড়িটি তৈরি হওয়ায় তার নামের সঙ্গে মিল রেখে এর নাম দেওয়া হয় ‘কলাবতী’। মূলত আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কলাগাছের আঁশ থেকে সুতা তৈরি করে তা দিয়ে শাড়িসহ বিভিন্ন হস্তশিল্পের পণ্য তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
শুরুতে কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরি করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন রাধাবতী দেবী। পরে পরীক্ষামূলকভাবে ছোট কাপড় তৈরি করেন তিনি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুরোধে প্রায় ১৫ দিনের চেষ্টায় একটি শাড়ি বুনতে সক্ষম হন এই তাঁতশিল্পী। তবে সেই সাফল্যের পর আর ধারাবাহিকতা তৈরি হয়নি। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে এ শিল্পের বিকাশে স্থায়ী কোনো প্রশিক্ষণকেন্দ্র কিংবা প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠেনি।
বান্দরবান বিসিক জেলা কার্যালয় ও বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড সূত্রে জানা যায়, কলাগাছের সুতা দিয়ে তৈরি শাড়ি বাজারজাত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেশি হওয়া এবং শাড়ির মসৃণতা ও আরামদায়ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকায় উদ্যোগটি সফল হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাজারে আনার আগে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
রাধাবতী দেবী জানান, এখন পর্যন্ত কলাগাছের সুতা দিয়ে তিনি মোট নয়টি শাড়ি তৈরি করেছেন। ২০২৩ সালের এপ্রিলে বান্দরবান জেলা প্রশাসকের আমন্ত্রণে প্রথম শাড়িটি বোনেন তিনি। এরপর একই বছরের সেপ্টেম্বরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শ্রীমঙ্গলের ডলুছড়া গ্রামের ত্রিপুরা জাতিগোষ্ঠীর নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ২০ দিনব্যাপী ওই প্রশিক্ষণে ৩০ জন নারীকে কলাগাছ থেকে সংগ্রহ করা সুতা দিয়ে শাড়ি বোনার কৌশল শেখানো হয়। সেখানে চারটি শাড়ি তৈরি করা হয়েছিল। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য তাঁকে ৮০ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
একই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত বান্দরবান জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা ৬০ দিনব্যাপী আরেকটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। সেখানে ৫০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নেন। এ প্রশিক্ষণেও চারটি শাড়ি তৈরি করা হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে তাকে ৬০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর কেউ এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি বলে জানান রাধাবতী দেবী।
তিনি বলেন, একটা শাড়ি তৈরি করতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগে। প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। শাড়ি তৈরি করতে কলা গাছের ৫০০ গ্রাম সুতার প্রয়োজন হয়। এছাড়াও আরও ৫০০ গ্রাম সুতার প্রয়োজন হয়। আমরা চাইলে বান্দরবন থেকে কলাগাছের সুতা নিয়ে আসতে পারব। তবে প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। শাড়ি বানাতে পারিশ্রমিক খরচ অনেক বেশি, এজন্য অর্থের প্রয়োজন। অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে আমরা শাড়ি তৈরি করতে পারছি না।
এই শিল্পের বিকাশে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে রাধাবতী দেবী বলেন, যে দুই জায়গায় প্রশিক্ষণ দিয়েছি তারা খরচ বহন করেছে। সরকারি বা বেসরকারিভাবে যদি উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে অনেক ভালো হবে। আমার কাছে টাকা নেই, তা না হলে আমি নিজেই উদ্যোগ নিতাম। কলা গাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির পরিপূর্ণ একটা শিল্প তৈরি করতে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার প্রয়োজন। এত টাকা আমার কাছে নেই। এজন্য ইচ্ছা থাকলেও কাজ করতে পারছি না। এই শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন।
কলাগাছের সুতা সংগ্রহের সীমাবদ্ধতার কথাও জানান এই তাঁতশিল্পী। তাঁর ভাষ্য, শাড়ি তৈরির উপযোগী কলাগাছ সিলেট অঞ্চলে নেই। এ জন্য বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকা থেকে কলাগাছ সংগ্রহ করে সেখান থেকে সুতা বের করতে হবে। বর্তমানে তিনি বিছানার চাদর তৈরি করেন। এসব চাদর দেশের পাশাপাশি বিদেশেও বিক্রি হয়।
বান্দরবান বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. শামীম আলম বলেন, কলাগাছের সুতা থেকে শাড়ি তৈরির কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। দুই মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও প্রকল্পটি সফল হয়নি। এ কারণে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মো. শামীম আলম বলেন, কারণ প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ থেকে সবকিছুতে অনেক বেশি ব্যয় হয়েছে। এছাড়াও এটির কীভাবে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যাবে এ বিষয়ে কোনো সঠিক তথ্য উপস্থাপন হয়নি প্রশিক্ষণে।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উপমহাব্যবস্থাপক (এসিসিআর ও মার্কেটিং) রতন চন্দ্র সাহা বলেন, কলাগাছের সুতা দিয়ে তৈরি শাড়ি এখনো বাজারে আনার মতো অবস্থায় পৌঁছায়নি। এ বিষয়ে তাঁত বোর্ডের একটি প্রতিনিধিদল বান্দরবান গিয়েছিল। তবে বাণিজ্যিকভাবে শাড়ি উৎপাদনের আগে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
রতন চন্দ্র সাহা বলেন, একটি শাড়িতে কতটুকু কলা গাছের সুতা ব্যবহার হবে এছাড়া অন্য সুতা কতটুকু ব্যবহার হবে, তা সুস্পষ্ট হয়নি। এছাড়াও মসৃণ ও আরামদায়ক হতে হবে। এসব নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, শুধু বান্দরবান নয়, বিভিন্ন জায়গায় কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে কেউ তাঁত বোর্ডের সহযোগিতা চাইলে তারা সহায়তা করবে।
গুগলে আমাদের খবর পেতে
