স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল আন্দালুসিয়ার পাহাড়ি জনপদে নতুন করে গড়ে উঠছে মুসলিমদের বসতি, ধর্মীয় চর্চা ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের নানা উদ্যোগ। একসময় মুসলিম শাসনাধীন এই অঞ্চলে বসবাস করতে এসে ইউরোপের অনেক মুসলিম খুঁজে পাচ্ছেন নিজেদের ইতিহাস, পরিচয় ও আত্মিক প্রশান্তির নতুন ঠিকানা।
ব্রিটিশ-হাঙ্গেরীয় মুসলিম হেনরিয়েটা সোভাতি ও তার স্বামী, থেরাপিস্ট ও ইমাম আজমল মাসরুর ২০২৪ সালে মালাগার আলোরার পাহাড়ে একটি পুরোনো খামারবাড়ি কেনেন। তাদের উদ্যোগের নাম ‘হাউস অব আন্দালুস’। প্রায় ১৪ হেক্টর জমিতে জলপাইগাছের পাশাপাশি ডালিম, ডুমুর ও আমগাছ লাগানো হচ্ছে। এখানে গড়ে তোলা হচ্ছে কোরআনে উল্লিখিত উদ্ভিদসমৃদ্ধ বাগান, গ্রন্থাগার এবং ইসলামি ইতিহাসবিষয়ক শিক্ষামূলক কার্যক্রম। মুসলিমদের পাশাপাশি অমুসলিমদের জন্যও উন্মুক্ত থাকবে এই কেন্দ্র।
বিজ্ঞাপন
ব্রিটেনে দুই দশকের বেশি সময় বসবাস করেও নিজেকে বহিরাগত মনে হতো হেনরিয়েটার। তার মতে, স্পেনে প্রতিবেশীদের কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বেশি গুরুত্ব পায়। স্থানীয় ক্যাথলিক প্রতিবেশী মারিয়া গার্সিয়ার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব আন্তধর্মীয় সহাবস্থানের একটি উদাহরণ। তবে ইউরোপজুড়ে অভিবাসনবিরোধী ও ইসলামবিদ্বেষী রাজনীতির উত্থান স্পেনে মুসলিমদের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।
ইতিহাসবিদ ও ভ্রমণলেখক তারিক হুসেইনের মতে, আল-আন্দালুসের ঐতিহ্য ইউরোপীয় মুসলিমদের মনে করিয়ে দেয়, ইসলাম এই মহাদেশের ইতিহাসের বাইরের কোনো বিষয় নয়। মধ্যযুগে প্রায় আট শতাব্দী ধরে আইবেরীয় উপদ্বীপের বিভিন্ন অংশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। কর্ডোবা, সেভিয়া ও গ্রানাডার স্থাপত্য, দুর্গ, আরবি লিপি, সেচব্যবস্থা এবং ভাষায় সেই শাসনের প্রভাব এখনো দৃশ্যমান।
গ্রানাডার বৃহৎ মসজিদ প্রতিষ্ঠার পেছনেও রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। কয়েক দশকের উদ্যোগ ও অর্থসংগ্রহের পর ২০০৩ সালে মসজিদটির দরজা খুলে দেওয়া হয়। স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে এটি ছিল ধর্মীয় পরিচয় ও সামাজিক অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
গ্রানাডার দক্ষিণে আলপুহারাস ও অর্গিভা অঞ্চলেও গড়ে উঠেছে বহুজাতিক মুসলিম সম্প্রদায়। লেখক ও শিক্ষক মেদিনা তেনুর হোয়াইটম্যানের মতে, আল-আন্দালুসের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো মুসলিমদের শিকড়ের অনুভূতি জোগালেও শুধু অতীতের গৌরব দিয়ে বর্তমানের জীবনকে বোঝা সম্ভব নয়। ভাষা শেখা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া এবং স্থানীয় সমাজের অংশ হয়ে ওঠাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শুধু স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ নয়। আলোরার ঐতিহ্যবাহী ‘সোপা পেরোতা’ নামের রুটির স্যুপের সঙ্গেও মধ্যযুগীয় আন্দালুসীয় রান্নার সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন খাদ্য-ইতিহাসবিদেরা। অর্থাৎ বহু শতাব্দী আগের মুসলিম ঐতিহ্য এখনো স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি ও জীবনযাপনের নানা স্তরে টিকে থাকতে পারে।
তবে আন্দালুসিয়াকে হারানো মুসলিম সাম্রাজ্যের পুনরাবিষ্কার হিসেবে দেখার পরিবর্তে বর্তমান স্পেনের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক বিভাজন এবং ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই নতুন করে নিজেদের জায়গা তৈরি করছেন মুসলিমরা।
হেনরিয়েটার স্বপ্ন, ‘হাউস অব আন্দালুস’ এমন একটি কেন্দ্র হয়ে উঠবে, যেখানে মানুষ ইতিহাসের পাশাপাশি প্রকৃতি, বিশ্বাস ও জীবনের অর্থ নিয়ে ভাবার সুযোগ পাবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অর্থ ও শ্রমের বড় চ্যালেঞ্জ থাকলেও তাঁর বিশ্বাস, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতেই স্থায়ী সম্প্রদায় গড়ে ওঠে।
আরএ
